আজকে আমরা অর্ধপরিবাহী প্রকারভেদ আলোচনা করবো। যা বাউবি এইচএসসি ২৮৭১ পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্র ইউনিট ১০ ইলেকট্রনিক্স এর অন্তর্ভুক্ত।

অর্ধপরিবাহী প্রকারভেদ
অর্ধপরিবাহী বা সেমিকন্ডাক্টর পদার্থকে দুভাবে বিভক্ত করা হয়। এগুলো হলো:
১। বিশুদ্ধ বা অন্তর্জাত অর্ধপরিবাহী (Pure or Intrinsic Semiconducter)
২। অবিশুদ্ধ বা বহির্জাত পরিবাহী (Impure or Extrinsic Semiconducter)
১। বিশুদ্ধ বা অন্তর্জাত অর্ধপরিবাহী ঃ
যে সব অর্ধপরিবাহীতে কোনো অপদ্রব্য (Impurity) থাকে বা মেশানো হয় না তাদেরকে বিশুদ্ধ বা অন্তর্জাত অর্ধপরিবাহী বলে।
উদাহরণঃ যে সব পদার্থের পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ কক্ষে সর্বোচ্চ ৪টি ইলেকট্রনের স্থানে 4টি যোজন ইলেকট্রন বিদ্যামান থাকে এবং যেগুলো পর্যায় সারণির চতুর্থ গ্রুপের সদস্য সেগুলো বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর অন্তর্ভূক্ত। যেমন –সিলিকন, জার্মেনিয়াম, টিন ইত্যাদি বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহী। বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীতে কক্ষ তাপমাত্রায় হোল-ইলেকট্রন জোড়ের সৃষ্টি হয়। ফলে এদের পরিবহন ব্যান্ডের ইলেকট্রন সংখ্যা এবং যোজন ব্যান্ডের হোলের সংখ্যা সমান হয়। বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীতে মুক্ত ইলেকট্রনের এবং হোলের সংখ্যা খুব কম হওয়াতে এদের তড়িৎ পরিবাহিতা খুব কম হয় এবং বাড়বে কোনো কাজে লাগানো যায় না ।
২। অবিশুদ্ধ বা বহির্জাত পরিবাহী :
বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে খুব সামান্য পরিমাণে (এক কোটি পরমাণুতে একটি পরমাণু) যথোপযুক্ত অপদ্রব্য মেশালে যে অর্ধপরিবাহীর সৃষ্টি হয় তাকে অবিশুদ্ধ বা দূষিত বা বহির্জাত অর্ধপরিবাহী বলে ।
বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে অপদ্রব্য মেশানোর ফলে এগুলোতে বিপুল পরিমাণ মুক্ত ইলেকট্রন বা মুক্ত হোলের সৃষ্টি হয়, ফলে সিলিকন বা জার্মেনিয়াম কেলাসের পরিবাহিতা অনেক গুণে বৃদ্ধি পায়। অপদ্রব্যযুক্ত এই অর্ধপরিবাহীকে বহির্জাত অর্ধপরিবাহী বলে। বিশুদ্ধ জার্মেনিয়াম, সিলিকন অর্ধপরিবাহীর সাথে বোরন, এ্যালুমিনিয়াম, ফসফরাস, আর্সেনিক ইত্যাদি অপদ্রব্য মিশিয়ে বহির্জাত অর্ধপরিবাহী তৈরি করা হয়।

ডোপিং (Doping) :
বহির্জাত অর্ধপরিবাহী তৈরির জন্য বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে সুনিয়ন্ত্রিত ও উপযুক্ত উপায়ে সামান্য পরিমাণ অপদ্রব্য মিশানোর প্রক্রিয়াকে ডোপিং বলে ।
ডোপিং এর ফলে অর্ধপরিবাহীর তড়িৎ পরিবাহিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ডোপিং এর জন্য দুই ধরনের অপদ্রব্য ব্যবহার করা হয়। যথা –
(ক) পর্যায় সারণির তৃতীয় সারির মৌল, যেমন –বোরন, অ্যালুমিনিয়াম, গ্যালিয়াম ইত্যাদি
(খ) পর্যায় সারণির পঞ্চম সারির মৌল, যেমন – ফসফরাস, আর্সেনিক, এন্টিমনি ইত্যাদি।
p – টাইপ এবং n- টাইপ অর্ধপরিবাহী
বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে কোনো ধরনের অপদ্রব্য মিশানো হয় তার উপর ভিত্তি করে বহির্জাত অর্ধপরিবাহীকে দু’ভাগে বিভক্ত করা হয়।
১। p- টাইপ অর্ধপরিবাহী।
২। n -টাইপ অর্ধপরিবাহী।
১। p- টাইপ অর্ধপরিবাহী ঃ
কোনো বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে সামান্য পরিমাণ ত্রিযোজী মৌল অপদ্রব্য হিসেবে মেশানো হলে, তাকে p- টাইপ অর্ধপরিবাহী বলে।

বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে অপদ্রব্যকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় উচ্চতাপে মেশানো হয়। অপদ্রব্যের পরিমাণ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যেন এর পরমাণুগুলো মূল অর্ধপরিবাহী কেলাসের গঠন কাঠামোর কোনো পরিবর্তন না ঘটিয়ে কেলাস ল্যাটিসে অর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। আমরা জানি, জার্মেনিয়াম বা সিলিকনের পরমাণুতে চারটি করে যোজন ইলেকট্রন রয়েছে। অপরদিকে অ্যালুমিনিয়াম পরমাণুতে তিনটি যোজন ইলেকট্রন আছে।
বিশুদ্ধ জার্মেনিয়ামের সাথে যদি উপযুক্ত মাত্রায় (দশ লক্ষে একটি) অ্যালুমিনিয়ামের মতো ত্রিযোজী মৌল মেশানো হয়, তা হলো ঐ কেলাসের গঠনের কোনো পরিবর্তন হয় না, কিন্তু পার্শ্ববর্তী চতুর্থোজী অর্ধপরিবাহীর সাথে সমযোজী বন্ধন গঠন করতে এর একটি ইলেকট্রনের ঘাটতি পড়ে। ফলে ঐ স্থানে বন্ধন তৈরি হয় না। এই ইলেকট্রন ঘাটতি মানেই ‘হোল’ সৃষ্টি হয়। প্রতিটি Al পরমাণু একটি করে হোল সৃষ্টি করে [চিত্র ]। এ হোলগুলো ইলেকট্রন গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে। এ জন্য অ্যালুমিনিয়াম পরমানুকে ‘গ্রাহক’ পরমাণু বলে। এভাবে প্রতিটি অ্যালুমিনিয়াম পরমাণু একটি করে হোল সৃষ্টি করে।
এভাবে খুব সামান্য পরিমাণ অ্যালুমিনিয়াম লক্ষ লক্ষ হোল সৃষ্টি করে। অ্যালুমিনিয়াম পরমাণুর ধনাত্মক হোল Ge – Ge বন্ধন থেকে একটি ইলেকট্রন গ্রহণ করলে যে পরমাণু থেকে এটি আসে সেখানে একটি হোলের সৃষ্টি হয়। সেই হোলকে পূর্ণ করার জন্য অন্য একটি ইলেকট্রন চলে আসে। এভাবে এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। ফলে মনে হয়, ধনাত্মক হোল পদার্থের মধ্য দিয়ে ইলেকট্রনের গতির বিপরীত দিকে গতিশীল হয়।
এছাড়া কক্ষ তাপমাত্রায় তাপীয় শক্তির প্রভাবে কিছু সমযোজী বন্ধন ভেঙ্গে যায় এবং পরিবহন ব্যান্ডে খুব সামান্য পরিমাণ ইলেকট্রন বিদ্যমান থাকে। এখানে গরিষ্ঠ আধান বাহক হলো হোল এবং লঘিষ্ঠ আধান বাহক হলো ইলেকট্রন। এখানে হোল অর্থাৎ ধনাত্মক চার্জের গতির ফলেই তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি হয়। এ কারণে এ ধরনের অর্ধপরিবাহীকে টাইপ P- অর্ধপরিবাহী বলে।
২। n -টাইপ অর্ধপরিবাহী :
কোনো বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে সামান্য পরিমাণ পঞ্চযোজী মৌল অপদ্রব্য হিসেবে মেশানো হলে তাকে -টাইপ অর্ধপরিবাহী বলে।

কিভাবে n-টাইপ অর্ধপরিবাহী তৈরি করা হয় তা ব্যাখ্যা করার জন্য একটি বিশুদ্ধ জার্মেনিয়ামের কেলাস বিবেচনা করি। আমরা জানি জ্যার্মেনিয়ামে পরমাণুতে চারটি যোজন ইলেকট্রন থাকে। অপরদিকে অপদ্রব্য পরমাণু আর্সেনিকের পাঁচটি যোজন ইলেকট্রন আছে। বিশুদ্ধ জার্মেনিয়ামের সাথে যদি উপযুক্ত মাত্রায় (দশ লক্ষে একটি) আর্সেনিকের মতো কোনো পঞ্চযোজী মৌল মেশানো হয়, তাহলে ঐ কেলাসের গঠনের কোনো পরিবর্তন হয় না, কিন্তু মিশ্রিত পরমাণুর পাঁচটি যোজন ইলেকট্রনের মধ্যে চারটি জার্মেনিয়াম পরমাণুর সাথে সমযোজী বন্ধন গঠন করে এবং একটি ইলেকট্রন উদ্বৃত্ত থাকে [চিত্র ]।
এই উদ্বৃত্ত ইলেকট্রনকে খুব সামান্য শক্তি সরবরাহ করে মুক্ত করা যায় এবং এগুলোই অর্ধপরিবাহীর তড়িৎ পরিবাহিতা বৃদ্ধি করে। প্রতিটি অপদ্রব্য পরমাণু (AS) কেলাসে একটি করে ইলেকট্রন দান করে। তড়িৎ পরিবহনের জন্য অপদ্রব্য পরমাণুগুলো ইলেকট্রন দান করে বলে এদেরকে ‘দাতা’ পরমাণু বলে। এভাবে খুব সামান্য পরিমাণ আর্সেনিক অপদ্রব্য লক্ষ লক্ষ মুক্ত ইলেকট্রন সৃষ্টি করে। এ ধরনের অর্ধপরিবাহীতে ইলেকট্রন অর্থাৎ ঋণাত্মক চার্জের গতির ফলেই প্রধানত তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি হয় বলে এদেরকে n-টাইপ অর্ধপরিবাহী বলে।
এছাড়া কক্ষ তাপমাত্রায় তাপীয় শক্তির প্রভাবে খুব সামান্য পরিমাণ হোল-ইলেকট্রন জোড়া সৃষ্টি হয়। তথাপি পঞ্চযোজী মৌল কর্তৃক সরবরাহকৃত মুক্ত ইলেকট্রনের সংখ্যা সৃষ্ট হোলের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি থাকে। এ কারণে ॥-টাইপ অর্ধপরিবাহীতে গরিষ্ঠ আধান বাহক হলো ইলেকট্রন এবং লঘিষ্ঠ আধান বাহক হলো হোল।
সার-সংক্ষেপ :
অন্তর্জাত অর্ধপরিবাহী ঃ
যে সব অর্ধপরিবাহীতে কোনো অপদ্রব্য থাকে না মেশানো হয় না তাদেরকে বিশুদ্ধ বা অন্তর্জাত অর্ধপরিবাহী বলে।
বহির্জাত পরিবাহী :
বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে খুব সামান্য পরিমাণে (এক কোটি পরমাণুতে একটি পরমাণু) যথোপযুক্ত অপদ্রব্য মেশালে যে অর্ধপরিবাহীর সৃষ্টি হয় তাকে অবিশুদ্ধ বা দূষিত বা বহির্জাত অর্ধপরিবাহী বলে।
ডোপিং :
বহির্জাত অর্ধপরিবাহী তৈরির জন্য বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে সুনিয়ন্ত্রিত ও উপযুক্ত উপায়ে সামান্য পরিমাণ অপদ্রব্য মিশানোর প্রক্রিয়াকে ডোপিং বলে।
p- টাইপ অর্ধপরিবাহী :
কোনো বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে সামান্য পরিমাণ ত্রিযোজী মৌল অপদ্রব্য হিসেবে মেশানো হলে, তাকে p- টাইপ অর্ধপরিবাহী বলে।
n -টাইপ অর্ধপরিবাহী :
কোনো বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে সামান্য পরিমাণ পঞ্চযোজী মৌল অপদ্রব্য হিসেবে মেশানো হলে তাকে n -টাইপ অর্ধপরিবাহী বলে।
বহুনির্বাচনী প্রশ্ন :
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন
১। p-টাইপ জার্মেনিয়াম অর্ধপরিবাহী তৈরির জন্য নিচের কোনটি দিয়ে ডোপিং করতে হবে?
(ক) আর্সেনিক
(খ) এন্টিমনি
(গ) অ্যালুমিনিয়াম
(ঘ) ফসফরাস
২। যখন বিশুদ্ধ সিলিকন অর্ধপরিবাহীতে অপদ্রব্য হিসেবে আর্সেনিক ডোপিং করা হয় তখন যা তৈরি হবে-
(ক) n -টাইপ অর্ধপরিবাহী
(খ) p-টাইপ অর্ধপরিবাহী
(গ) n-টাইপ পরিবাহী
(ঘ) কোনটিই না
