আধান বাহক : ইলেকট্রন ও হোলের ধারণা

আজকে আমরা আধান বাহক : ইলেকট্রন ও হোলের ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা বাউবি এইচএসসি ২৮৭১ পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্র ইউনিট ১০ ইলেকট্রনিক্স এর অন্তর্ভুক্ত।

 

আধান বাহক : ইলেকট্রন ও হোলের ধারণা

 

আধান বাহক : ইলেকট্রন ও হোলের ধারণা

ইলেকট্রন :

আমরা জানি, সকল পদার্থই অতি ক্ষুদ্র কণিকা দ্বারা গঠিত। এদেরকে পরমাণু বলে। পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে ধনাত্মক আধানযুক্ত নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণা ইলেকট্রন বিভিন্ন কক্ষপথে আবর্তন করে। ইলেকট্রনিক্সে অত্যল্ড ক্ষুদ্র কণিকা ইলেকট্রন নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাই ইলেকট্রন সম্পর্কে ধারণা থাকা অতীব প্রয়োজন। আমরা পূর্বেই জেনেছি যে, ইলেকট্রন হলো ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণা এবং এর ভর নগন্য। ইলেকট্রনের কিছু গুরত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো :

(ক) ইলেকট্রনের আধান, e = 1.602×10-19 C;

(খ) ইলেকট্রনের ভর, m = 9.0×10-31 kg;

(গ) ইলেকট্রনের ব্যাসার্ধ, r = 1.9×10-15 m এবং

(ঘ) ইলেকট্রনের আপেক্ষিক আধান, e/m=1.77×1011 Ckg-1

ইলেকট্রনের আপেক্ষিক আধানের মান থেকে দেখা যায় যে, ইলেকট্রনের আধানের তুলনায় এর ভর খুবই কম। ইলেকট্রনের এ ধর্মের কারণে এর গতিশীলতা অনেক বেশি এবং এটি তড়িৎক্ষেত্র অথবা চৌম্বকক্ষেত্র দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়।

পরমাণুতে নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রনের মধ্যে দুধরনের শক্তি বিদ্যমান থাকে। এর গতির জন্য থাকে গতিশক্তি এবং নিউক্লিয়াসের আধানের জন্য থাকে বিভবশক্তি। ইলেকট্রনের মোট শক্তি এর গতিশক্তি ও বিভবশক্তির যোগফলের সমান ।

 

মুক্ত ইলেকট্রন :

কোনো কোনো পদার্থে, বিশেষ করে ধাতব পদার্থে যোজন ইলেকট্রনগুলির শক্তি এত বেশি থাকে যে, এগুলো নিউক্লিয়াসের সাথে খুব হালকাভাবে আবদ্ধ থাকে। হালকাভাবে আবদ্ধ এই যোজন ইলেকট্রনগুলো পদার্থের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়ায়। এগুলোকে মুক্ত ইলেকট্রন বলে। যোজন ইলেকট্রনগুলোর মধ্যে যেগুলো অত্যন্ড্র হালকাভাবে নিউক্লিয়াসের সাথে আবদ্ধ থাকে সেগুলোকে মুক্ত ইলেকট্রন বলে ।

বাইরে থেকে সামান্য পরিমাণ শক্তি সরবরাহ করা হলে মুক্ত ইলেকট্রনগুলো সহজেই চলাচল করতে পারে। এই মুক্ত ইলেকট্রন গুলোই কোনো পদার্থের তড়িৎ পরিবাহিতা ধর্ম নির্ধারণ করে। পরিবাহীতে প্রচুর পরিমাণে মুক্ত ইলেকট্রন থাকে। সাধারণ তাপমাত্রায় অক পদার্থে কোনো মুক্ত ইলেকট্রন থাকে না। অর্ধ পরিবাহীতে কক্ষ তাপমাত্রায় খুবই স্বল্প সংখ্যক মুক্ত ইলেকট্রন থাকে।

 

আধান বাহক : ইলেকট্রন ও হোলের ধারণা

 

হোল (Hole) :

জার্মেনিয়াম, সিলিকন প্রভৃতি অর্ধপরিবাহী পদার্থের পরমাণুর বাইরের কক্ষপথে 4 টি যোজন ইলেকট্রন থাকার ফলে এগুলো প্রতিবেশী পরমাণুর ইলেকট্রনের সাথে ইলেকট্রন ভাগাভাগি করে বাইরের কক্ষপথে অষ্টক পূর্ণ করে অর্থাৎ সমযোজী বন্ধন (Covalent Band) গঠন করে। ফলশ্রুতিতে বিশুদ্ধ জার্মেনিয়াম বা সিলিকনে কোনো স্বাধীন বা মুক্ত ইলেকট্রন থাকে না। তাই নিম্ন তাপমাত্রায় তাদের কোনো পরিবহন ক্ষমতা থাকে না।

কক্ষ তাপমাত্রায় বা একটু বেশি তাপমাত্রায় বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর কিছু সংখ্যক সমযোজী বন্ধন ভেঙ্গে যায় এবং মুক্ত ইলেকট্রন সৃষ্টি হয়। বিভব পার্থক্য বা তড়িৎক্ষেত্রের প্রভাবে এই মুক্ত ইলেকট্রনগুলো তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি করে। একই সময়ে অন্য একটি প্রবাহ যাকে হোল প্রবাহ বলে, ইলেকট্রনের গতির বিপরীত দিকে সৃষ্টি হয়।

তাপীয় শক্তির জন্য ইলেকট্রন যখন কোনো সমযোজী বন্ধন ভেঙ্গে বের হয়ে আসে তখন ইলেকট্রনের এই অপসারণ সমযোজী বন্ধনে একটি শূন্য স্থান রেখে আসে। ইলেকট্রনের এই শূন্যতা বা অনুপস্থিতিকে হোল বলা হয়, যেটি ধনাত্মক আধান হিসেবে কাজ করে।

 

আধান বাহক : ইলেকট্রন ও হোলের ধারণা

 

একটি হোলের চার্জ 1.6×10-19 C। যখনই একটি ইলেকট্রন মুক্ত হয়, তখনই একটি হোলের সৃষ্টি হয়। সুতরাং তাপীয় শক্তি হোল-ইলেকট্রন জোড় সৃষ্টি করে। যতগুলো মুক্ত ইলেকট্রন সৃষ্টি হয় ততগুলোই হোলের সৃষ্টি হয়। হোল কীভাবে তড়িৎপ্রবাহ সৃষ্টি করে তা [চিত্র] এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হলো। হোল হলো একটি ইলেকট্রনের অনুপস্থিতি।

ধরা যাক, L বিন্দুতে অবস্থিত যোজন ইলেকট্রন তাপীয় শক্তির প্রভাবে মুক্ত ইলেকট্রনে পরিণত হলো। এর ফলে সমযোজী বন্ধনের L বিন্দুতে একটি হোলের সৃষ্টি হলো। এই হোল ইলেকট্রনের জন্য একটি শক্তিশালী আকর্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে নিকটবর্তী সমযোজী বন্ধন থেকে একটি যোজন ইলেকট্রন (ধরা যাক, M বিন্দুর) L বিন্দুস্থ হোলকে পূর্ণ করার জন্য চলে আসে।

এর ফলে M বিন্দুতে একটি হোলের উদ্ভব হয়। অন্য একটি যোজন ইলেকট্রন (N বিন্দুর) এর বন্ধন থেকে বের হয়ে এসে M বিন্দুতে অবস্থিত হোলকে পূর্ণ করবে এবং N বিন্দুতে একটি হোলের সৃষ্টি করবে। সুতরাং ধনাত্মক আধানযুক্ত হোল যখন L থেকে N এর দিকে যায় অর্থাৎ তড়িৎ উৎসের ঋণাত্মক প্রাড়ের দিকে যায়, তখনই হোল তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি হয়। এখানে মনে রাখতে হবে যে হোল প্রবাহের সৃষ্টি হয় এক সমযোজী বন্ধন থেকে অন্য সমযোজী বন্ধনে যোজন ইলেকট্রনের গতির ফলে।

হোল প্রবাহের শক্তি ব্যান্ড বর্ণনা :

শক্তি ব্যান্ডের সাহায্যে হোল তড়িৎ প্রবাহকে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ধরা যাক তাপীয় শক্তির দ্বারা একটি যোজন ইলেকট্রন যোজন ব্যান্ড হতে পরিবহন ব্যান্ডে গমন করে। ফলে যোজন ব্যান্ডে একটি শূন্যতা বা হোলের সৃষ্টি হয় (L বিন্দুতে)। এখন M বিন্দুর যোজন ইলেকট্রন L বিন্দুর হোলকে পূর্ণ করার জন্য চলে আসে। ফলে L বিন্দুস্থ হোল বিলুপ্ত হয় এবং M বিন্দুতে হোলের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে N বিন্দুর যোজন ইলেকট্রন M শক্তি বিন্দুর হোলকে পূর্ণ করার জন্য M বিন্দুতে আসে। ফলশ্র“তিতে N বিন্দুতে হোলের সৃষ্টি হয়। সুতরাং যোজন ইলেকট্রন PNML পথ বরাবর গতিশীল হয়, যেখানে হোল এর বিপরীত দিকে অর্থাৎ LMNP পথ বরাবর গতিশীল হয়।

 

আধান বাহক : ইলেকট্রন ও হোলের ধারণা

 

সার-সংক্ষেপ :

পরমাণু :

সকল পদার্থই অতি ক্ষুদ্র কণিকা দ্বারা গঠিত। এদেরকে পরমাণু বলে।

মুক্ত ইলেকট্রন :

কোনো কোনো পদার্থে, বিশেষ করে ধাতব পদার্থে যোজন ইলেকট্রনগুলির শক্তি এত বেশি থাকে যে, এগুলো নিউক্লিয়াসের সাথে খুব হালকাভাবে আবদ্ধ থাকে। হালকাভাবে আবদ্ধ এই যোজন ইলেকট্রনগুলো পদার্থের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়ায়। এগুলোকে মুক্ত ইলেকট্রন বলে ।

হোল :

তাপীয় শক্তির জন্য ইলেকট্রন যখন কোনো সমযোজী বন্ধন ভেঙ্গে বের হয়ে আসে তখন ইলেকট্রনের এই অপসারণ সমযোজী বন্ধনে একটি শূন্য স্থান রেখে আসে। ইলেকট্রনের এই শূন্যতা বা অনুপস্থিতিকে হোল বলা হয়, যেটি ধনাত্মক আধান হিসেবে কাজ করে।

বহুনির্বাচনী প্রশ্ন :

সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন ১। একটি অর্ধ পরিবাহী পদার্থে তড়িৎ পরিবাহিতার জন্য দায়ী কোনটি?

(ক) হোল

(খ) মুক্ত ইলেকট্রন

(গ) মুক্ত ইলেকট্রন ও হোল

(গ) মুক্ত ইলেকট্রন ও প্রোটন

২। একটি বিশুদ্ধজাত অর্ধপরিবাহীতে কক্ষ তাপমাত্রায় কিছু হোল আছে। হোল সৃষ্টির কারণ-

(ক) ডোপিং

(খ) মুক্ত ইলেকট্রন

(গ) তাপীয় শক্তি

(ঘ) যোজন ইলেকট্রন

Leave a Comment