আজকে আমরা আলোচনা করবো কির্শফের সূত্র: হুইটস্টোন ব্রীজ নীতি । যা বাউবি এইচএসসি ২৮৭১ পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্র ইউনিট ২ চল তড়িৎ এর অন্তর্ভুক্ত।

কির্শফের সূত্র: হুইটস্টোন ব্রীজ নীতি
কির্শফের সূত্র (Kirchhof’s Law)
ওমের সূত্র প্রয়োগ করে সরল বর্তনীর প্রবাহমাত্রা, রোধের মান প্রভৃতি সহজেই নির্ণয় করা যায়। কিন্তু জটিল বর্তনীর প্রবাহমাত্রা, রোধ নির্ণয় করা ওরে সূত্র দ্বারা সম্ভব নয়। জটিল বর্তনীর প্রবাহমাত্রা, রোধ ইত্যাদি নির্ণয়ের জন্য জার্মান বিজ্ঞানী কির্শফ দুটি সূত্র প্রদান করেন। সরল বর্তনীতেও এই সূত্র দুটি প্রয়োগ করা যায়। নিচে সূত্রগুলো বিবৃত ও ব্যাখ্যা করা হলো ।
প্রথম সূত্রঃ
তড়িৎ বর্তনীর কোনো বিন্দুতে মিলিত প্রবাহসমূহের বীজগাণিতিক যোগফল শূন্য হয়।
অর্থাৎ ΣI = 0 …………..(1)
ব্যাখ্যা:
ধরা যাক, O বিন্দুতে I1, I2, 13, 14 ও I5 মাত্রার প্রবাহ মিলিত হয়েছে। এখানে পাঁচটি প্রবাহের দিক ভিন্ন। চিত্র ২.৫ অনুযায়ী I1, 14 ও Is প্রবাহ O বিন্দুতে প্রবেশ করছে এবং I, ও I; প্রবাহ O বিন্দু হতে নির্গত হচ্ছে। সাধারণ নিয়ম অনুসারে, সংযোগ বিন্দু অভিমুখী প্রবাহ মাত্রাগুলোকে ধনাত্মক এবং সংযোগ বিন্দু হতে বহি:মুখী প্রবাহ মাত্রাগুলোকে ঋণাত্মক ধরা হয়। সুতরাং O বিন্দুতে মিলিত প্রবাহগুলোর উপর কির্শফের ১ম সূত্র প্রয়োগ করে পাই।

I1 – I2 – 13 + 14 + I5 = 0
I1 +I4+ I5 = I2 + I3 ……………(2)
যেহেতু বর্তনীর কোনো বিন্দুতেই তড়িৎ আধান জমা হয় না সুতরাং যেকোনো সংযোগ বিন্দুতে আগত মোট প্রবাহ ঐ বিন্দু হতে নির্গত মোট প্রবাহের সমান হবে।
দ্বিতীয় সূত্রঃ
কোনো আবদ্ধ তড়িৎ বর্তনীর বিভিন্ন অংশগুলোর রোধ ও তাদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সংশিণ্টষ্ট প্রবাহমাত্রার গুণফলের বীজগাণিতিক সমষ্টি ঐ বর্তনীর অন্তর্ভুক্ত মোট তড়িচ্চালক শক্তির সমান।
অর্থাৎ ΣIR = ΣE……………(3)
ব্যাখ্যাঃ
চিত্র একটি বদ্ধ বর্তনী নির্দেশ করে। বর্তনীতে R1, R2 ও R3 মানের রোধ এবং দুটি তড়িচ্চালক শক্তির উৎস E1 ও E2 সংযুক্ত আছে। তীরচিহ্ন দ্বারা বর্তনীতে প্রবাহের অভিমুখ দেখানো হয়েছে।
কির্শফের দ্বিতীয় সূত্রানুসারে, কোনো বদ্ধ বর্তনীর বিভিন্ন অংশে যে পরিমাণ তড়িৎ প্রবাহিত হয়, সেসব প্রবাহমাত্রাকে তাদের আনুষাঙ্গিক রোধ দ্বারা গুণ করলে, গুণফলগুলোর যোগফল ঐ বর্তনীর মোট তড়িচ্চালক শক্তির সমান হবে।
চিত্রটিতে নিম্নোক্ত নিয়মগুলো অনুসরণ করে কির্শফের উপপাদ্য প্রয়োগ করা হয়।
প্রথমত, আমরা জানি, তড়িৎ উচ্চ বিভব থেকে নিম্ন বিভবের দিকে প্রবাহিত হয়। তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখে কোনো রোধ অতিক্রম করলে বিভবের মান ঋণাত্মক (– IR) ধরা হয় এবং তড়িৎ প্রবাহের বিপরীতে রোধ অতিক্রম করলে বিভবের মান ধনাত্মক (+ IR) ধরা হয়।
দ্বিতীয়ত, কোষের ঋণাত্মক পাত থেকে ধনাত্মক পাতের দিকে তড়িচ্চালক শক্তি E কে ধনাত্মক ধরা হয়। আবার কোষের ধনাত্মক পাত থেকে ঋণাত্মক পাতের দিকে E কে ঋণাত্মক ধরা হয়।

চিত্রে BAFE লুপ বিবেচনা করলে পাই,
E1 – I1 R1 – 13 R3 = 0
বা, I1 R1 + I3 R3 = E1
বা, ΣIR = E1
আবার BEDC লুপ থেকে পাই,
I3R3 + I2 R2 – E2 = 0
বা, I3 R3 + I2 R2 = E2
বা, ΣIR = E2
সম্পূর্ণ বর্তনী অর্থাৎ AFEDCBA লুপটিতে দুটি তড়িৎ উৎস রয়েছে। তাহলে,
– I1 R1 + I2 R 2 – E2 + E1 = 0
বা, I1 R1 – I2 R2 = E2 – E1
ΣIR = ΣE
কির্শফের সূত্রের ব্যবহার (Application of Kirchhof’s Law):
হুইটস্টোন ব্রীজনীতি প্রতিপাদন
চারটি রোধকে শ্রেণিবদ্ধভাবে এমনভাবে সজ্জিত করা হয় যাতে একটি আবদ্ধ লুপ তৈরী হয়। আবদ্ধ লুপের যে চারটি সংযোগস্থল তৈরী হয়, তার যেকোনো দুটি বিপরীত সংযোগস্থলের মাঝখানে একটি তড়িৎ কোষ এবং অপর দুটি সংযোগস্থলের মাঝে একটি গ্যালভানোমিটার সংযুক্ত করলে যে বর্তনী তৈরী হয় তাকে হুইটস্টোন ব্রীজ বলা হয়।
ধরা যাক, P, Q, S ও R চারটি রোধ পরপর শ্রেণিবদ্ধভাবে সাজিয়ে ABCD চতুর্ভূজের ন্যায় একটি আবদ্ধ বর্তনী গঠন করা হলো (চিত্র-২.৭)। P ও R এর সংযোগস্থল A এবং Q ও S এর সংযোগস্থল CIA এবং C কে একটি কোষ E এবং চাবি k দ্বারা যুক্ত করা হলো। P ও Q এর সংযোগস্থল B এবং R ও S এর সংযোগস্থল D এর মাঝখানে একটি গ্যালভানোমিটার G দ্বারা যুক্ত করা হলো। এই বর্তনীকে হুইটস্টোন ব্রীজ বলা হয়।

চাবি k বন্ধ করে বর্তনীতে তড়িৎপ্রবাহ চালনা করলে প্রবাহমাত্রা I, A বিন্দুতে এসে I ও In দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যথাক্রমে রোধ P ও R এর মধ্য দিয়ে B ও D বিন্দুতে পৌঁছে। এখন B বিন্দুর বিভব যদি D বিন্দুর বিভবের চেয়ে বেশী হয় তাহলে Ip এর কিছু অংশ, Ig গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে D বিন্দুতে এসে IR এর সাথে মিলে Is হয়ে S এর মধ্য দিয়ে C বিন্দুতে পৌঁছায়। Ip এর বাকি অংশ IQ হয়ে Q এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে C তে পৌঁছে Is এর সাথে মিলিত হয়ে মূল প্রবাহ I হয়ে E তে ফিরে আসে।
একইভাবে, D বিন্দুর বিভব যদি B বিন্দুর চেয়ে বেশী হয় তাহলে IR এর কিছু অংশ গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে B বিন্দুতে এসে Ip এর সাথে মিলে IQ হয়ে Q এর মধ্য দিয়ে C তে পৌঁছায় এবং IR এর বাকি অংশ S এর মধ্য দিয়ে C তে পৌঁছে মূল প্রবাহ I হয়ে E তে ফিরে আসে ।
কিন্তু যখন B ও D বিন্দুর বিভব সমান হয় তখন গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে কোনো প্রবাহ চলবে না অর্থাৎ Ig = 0 হবে এবং গ্যালভানোমিটারে কোন বিক্ষেপ হয় না। এই অবস্থাকে সাম্যাবস্থা (Balanced condition) বা নিস্পন্দ অবস্থা (Null condition) বলা হয়।
চিত্রানুযায়ী B ও D বিন্দুতে কির্শফের ১ম সূত্র প্রয়োগ করে পাওয়া যায়,
Ip – Ig- IQ = 0
Ip = Ig+ lQ
এবং IR+Ig-Is=0
:. Is = IR + Ig
আবার ABDA এবং BCDB আবদ্ধ বর্তনী দুইটিতে কির্শফের দ্বিতীয় সূত্র প্রয়োগ করে পাওয়া যায়,
Ip P + IgG – IRR = 0 ……………(4)
এবং IQQ – IsS – IgG = 0 ……………(5)
ব্রীজের সাম্যাবস্থায়, Ig = 0
এই অবস্থায় সমীকরণ (২.১১) ও (২.১২) থেকে পাওয়া যায়, Ip = lQ এবং Is = IR
সমীকরণ (4) ও (5) থেকে পাওয়া যায়, lp P = IRR এবং IQ Q = Is S ………………….(6)
সমীকরণ (6) কে (7) দ্বারা ভাগ করে পাই,
IPP/IQQ = IRR=ISS
বা, P /Q = R/S = …… (7)
এটি হুইটস্টোন ব্রীজের সাম্যাবস্থার শর্ত। হুইটস্টোন ব্রীজের সাম্যাবস্থায় চারটি রোধের মধ্যে যেকোনো তিনটি রোধ জানা থাকলে চতুর্থ রোধটি নির্ণয় করা যায়।

উদাহরণ ১ :
একটি হুইটস্টোন ব্রীজের চার বাহুতে যথাক্রমে 6, 18, 10 এবং 60 ওমের রোধ যুক্ত আছে। চতুর্থ বাহুতে কত মানের একটি রোধ কীভাবে যুক্ত করলে ব্রীজটি সাম্যাবস্থায় আসবে?
এখানে,
প্রথম বাহুতে রোধ, P = 62
দ্বিতীয় বাহুতে রোধ, Q = 182
তৃতীয় বাহুতে রোধ, R = 10 Q
চতুর্থ বাহুতে রোধ, S1 = 6052
চতুর্থ বাহুতে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত রোধ, S2 = ?
সাম্যাবস্থায় চতুর্থ বাহুর রোধ s হলে,
P /Q = R/S
বা, S = Q/P × R
বা, 18/6 ওহম x 10 ওহম
= 30ওহম
এই রোধ, S চতুর্থ বাহুতে অবস্থিত S এর চেয়ে ছোট। সুতরাং চতুর্থ বাহুতে সমাালভাবে S2 রোধ সংযুক্ত করতে হবে যাতে তুল্য রোধ S হয়।
1/S = 1/S₁ + 1/S2
বা, 1/S2 = 1/S – 1/S₁
= 1/30 -1/ 60
= 2-1 /60
1/60ওহম
S2 = 60 ওহম
উত্তর: সমান্তরাল, 60 ওহম
উদাহরণ ২ :
2V তড়িচ্চালক শক্তি এবং 22 অভ্যরীণ রোধের একটি কোষ সমাাল সমবায়ে 5 12 এবং 10 12 রোধবিশিষ্ট দুটি রোধকের সাথে সংযুক্ত। কির্শফের সূত্র প্রয়োগ করে কোষ দ্বারা প্রেরিত প্রবাহমাত্রা এবং প্রত্যেক রোধকের মধ্যে প্রবাহমাত্রা বের কর ।

A বিন্দুতে কির্শফের প্রথম সূত্র প্রয়োগ করে পাই, I = I1 + I2 ……(1)
EAR1BE বদ্ধ লুপে কির্শফের দ্বিতীয় সূত্র প্রয়োগ করে পাই,
1 × 2 + I1 × 5 = 2
বা, 2 (I1 + 12) + 571 = 2
বা, 7I1, + 2I2 = 2 ……(1)
AR1BR2A বদ্ধ লুপে কির্শফের দ্বিতীয় সূত্র প্রয়োগ করে পাই,
I x 5-I2 x 10 = 0
বা, I1 = 212 ……(2)
I1 এর মান (2) নং সমীকরণে বসিয়ে পাই,
7 × 2I2 +2I2 =2
বা, 16I2=2
I2 = 0.125 A এবং I1 = 2I2 = 2 × 0.125 = 0.25 A
কোষ দ্বারা প্রবাহ, I = I1 + I2 = 0.125 + 0.25 = 0.375 A
উত্তর: 11 = 0.25 A, 2 = 0.125 A এবং I = 0.375 A
সার-সংক্ষেপ :
কির্শফের প্রথম সূত্রঃ
তড়িৎ বর্তনীর কোনো বিন্দুতে মিলিত প্রবাহসমূহের বীজগাণিতীক যোগফল শূন্য হয় ।
অর্থাৎ 21 = 0

কির্শফের দ্বিতীয় সূত্রঃ
কোনো আবদ্ধ তড়িৎ বর্তনীর বিভিন্ন অংশগুলোর রোধ ও তাদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সংশি−ষ্ট প্রবাহমাত্রার গুণফলের বীজগাণিতিক সমষ্টি ঐ বর্তনীর অন্তর্ভূক্ত মোট তড়িচ্চালক শক্তির সমান।
অর্থাৎ ΣIR = ΣE
বহুনির্বাচনী প্রশ্নঃ
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন
১। একটি হুইটস্টোন ব্রীজে P, Q, R বাহু তিনটিতে যথাক্রমে 1 2, 2 2 3 3 52 রোধ আছে। চতুর্থ বাহুতে কত মানের রোধ যুক্ত করলে ব্রীজটি সাম্যাবস্থায় থাকবে?
ক) 22
খ) 42
গ) 62
ঘ) 812
২। কির্শফের সূত্রানুসারে
i) ΣI = 0
ii) ΣIR = 0
iii) ΣIR = ΣE
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) i ও ii
খ) i ও iii
গ) ii ও iii
ঘ) i, ii ও iii
