চাপের প্রভাবের বর্ণনা – পদার্থবিজ্ঞান পদার্থ ও তার গতির বিজ্ঞান। বাংলায় “পদার্থবিজ্ঞান” শব্দটি একটি সমাসবদ্ধ পদ। “পদার্থ” ও “বিজ্ঞান” দুটি সংস্কৃত শব্দ নিয়ে এটি গঠিত। এর ইংরেজি পরিভাষা Physics শব্দটি গ্রিক φύσις (ফুঁসিস) অর্থাৎ “প্রকৃতি”, এবং φυσικῆ (ফুঁসিকে) অর্থাৎ “প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞান” থেকে এসেছে। পদার্থবিজ্ঞান বলতে বলা যেতে পারে এটা হলো গণিতের বাস্তব রূপ।
গলনাঙ্ক এবং স্ফুটনাঙ্কের উপর চাপের প্রভাবের বর্ণনা
গলনাঙ্ক ঃ কোনো কঠিন পদার্থে তাপ প্রয়োগ করলে ঐ পদার্থের তাপমাত্রার বৃদ্ধি ঘটে। যদি চাপ স্থির রেখে তাপ প্রয়োগ করা হয় তবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তাপ গ্রহণ করার পর বন্ধুটির তাপমাত্রার কোনো পরিবর্তন ঘটে না। কিন্তু বস্তুটির অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। অর্থাৎ কঠিন পদার্থটি গলে তরলে পরিণত হতে থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত পদার্থ গলে তরল পদার্থে রূপান্তরিত না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তাপমাত্রার কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
গলনাঙ্কের সংজ্ঞা ঃ নির্দিষ্ট চাপে যে তাপমাত্রায় কোনো কঠিন পদার্থে তাপ প্রয়োগ করলে কঠিন পদার্থ হতে তরল পদার্থে রূপান্তরিত হতে থাকে এবং সমস্ত পদার্থ তরলে রূপান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত তাপমাত্রার কোনো পরিবর্তন ঘটে না। ডাকে ঐ চাপে ঐ কঠিন পদার্থের গলনাঙ্ক বলা হয়।
গলনাঙ্কের উপর চাপের প্রভাব (Effect of pressure on melting point) : কোনো কঠিন পদার্থের গলনাঙ্ক চাপের উপর নির্ভরশীল । চাপের পরিবর্তন ঘটলে গলনাঙ্কের পরিবর্তন ঘটে। পদার্থের ধর্মের উপর ভিত্তি করে দু’ধরনের গলনাঙ্কের পরিবর্তন দেখা যায়, যথা-
১। কঠিন পদার্থ হতে তরলে রূপান্তরের সময় আয়তন বৃদ্ধি পায়।
২। কঠিন পদার্থ হতে তরলে রূপান্তরের সময় আয়তন হ্রাস পায়।
১। কঠিন পদার্থ থেকে তরলে রূপান্তরের সময় আয়তন বৃদ্ধি পায় : মোম, সোনা, রুপা, তামা ইত্যাদি কঠিন পদার্থ হতে তরল পদার্থে রূপান্তরিত করলে এদের আয়তনের বৃদ্ধি ঘটে। এদের উপর চাপ বৃদ্ধি করলে গলনাঙ্ক বৃদ্ধি পায়, কারণ প্রযুক্ত চাপ আয়তন বৃদ্ধি না করে বরং আয়তন কমাতে চেষ্টা করে। এতে গলতে বাধা পায় এবং বেশি তাপমাত্রায় পদার্থটি গলতে থাকে।
২। কঠিন পদার্থ থেকে তরলে রূপান্তরের সময় আয়তন হ্রাস পায় : পানি, পিতল, ঢালাই লোহা, পিচ, সীসা ইত্যাদি যা কঠিন পদার্থ হতে তরল পদার্থে রূপান্তরের সময় এর আয়তনে হ্রাস পায় এবং এদের উপর চাপ প্রয়োগ করলে গলনাঙ্ক হ্রাস পায়। কারণ প্রযুক্ত চাপ পদার্থটির আয়তন সংকোচনে সহায়তা করে গলনাঙ্ক কমিয়ে দেয়।
(ক) বরফের গলনাঙ্কের উপর চাপের প্রভাব পরীক্ষা (মাউসনের
পরীক্ষা ঃ একটি সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমে “মাউসন” গলনাঙ্কের উপর চাপের প্রভাব প্রদর্শন করেন।
পরীক্ষা ঃ এই যন্ত্রে C একটি শক্ত লোহার চোঙ, যার নিচের মুখে হাতল AD যুক্ত একটি স্ক্রু ছিপি S এবং উপরের মুখে একটি স্ক্রু পিস্টন P আছে। চোঙের নিচের AD হাতল দ্বারা ছিপি S ঘুরিয়ে খোলা বা বন্ধ করা যায়। আবার উপরের H হাতল ঘুরিয়ে পিস্টনকে উঠানো-নামানো যায়।
প্রথমে চোঙের দুই-তৃতীয়াংশ পানিতে পূর্ণ করে হিমমিশ্রণে শীতল করা হয়। ফলে পানি জমে বরফে পরিণত হবে। এরপর বরফের উপর একটি ধাতব বল B রেখে হাতল H ঘুরিয়ে পিস্টন P দ্বারা বলটির উপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। এখন হাতল AD এর সাহায্যে ভূ S খুললে দেখা যাবে যে, বলটি চোঙের তলায় চলে এসেছে। কিন্তু চোঙের পানি জমাট অবস্থায় আছে।

ব্যাখ্যা ঃ চাপ প্রয়োগের ফলে বলের নিচের বরফের গলনাঙ্ক কমে যায়। বলের চারদিকের এবং বরফের তাপমাত্রা সেলসিয়াস থাকায় শুধুমাত্র বলের নিচের অংশ পানিতে পরিণত হবে। ফলে বলটি নিচে চলে আসে। বল নিচে চলে আসবে উপরের বরফ গলা পানি চাপমুক্ত হয়। আবার পুনরায় ° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হিমাঙ্কে ফিরে আসে এবং তাপ বর্জ করে পুনরায় বরফে পরিণত হয়। এভাবে বল ক্রমশ নিচে নামে এবং বলের উপরের পানি পুনরায় বরফে পরিণত হয়। সুতরাং প্রমাণিত হল চাপ প্রয়োগ করলে গলনাঙ্ক হ্রাস ঘটে।
স্ফুটনাঙ্ক (Boiling point) :
সংজ্ঞা : একটি নির্দিষ্ট চাপে কোনো একটি তরল পদার্থ যে তাপমাত্রায় পৌঁছিয়ে বাষ্পে পরিণত হতে শুরু করে এ সম্পূর্ণ তরল পদার্থ বাষ্পে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত ঐ তাপমাত্রায় কোনোরূপ পরিবর্তন হয় না, তাকে উক্ত চাপে পদার্থের স্ফুটনাঙ্ক বলে।
ব্যাখ্যা ঃ “স্বাভাবিক চাপে পানির স্ফুটনাঙ্ক 100°C। এটি দ্বারা বুঝা যায় যে, স্বাভাবিক চাপে পানির স্ফুটন 100°C তাপমাত্রায় শুরু হয় এবং সম্পূর্ণ পানি বাষ্পে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত তাপমাত্রার কোনো পরিবর্তন হয় না।
স্ফুটনাঙ্কের উপর চাপের প্রভাব (Effect of pressure on bolling point) : কোনো তরলের স্ফুটনাঙ্কের উপর প্রদত্ত চাপের উপর নির্ভর করে। চাপ কমালে স্ফুটনাঙ্ক কমে যায় আবার চাপ বাড়ালে স্ফুটনাঙ্ক বৃদ্ধি পায়। নিম্নে স্ফুটনাংক এবং চাপের লেখ অংকন করা হল- চিত্র হতে দেখা যায় যে, বায়ুমণ্ডলীয় চাপ বৃদ্ধির ফলে স্ফুটনাংক বৃদ্ধি পায় এবং চাপ কমলে স্ফুটনাংক হ্রাস পায়।
স্ফুটনাঙ্ক কোনো তরল পদার্থের উপর চাপ বৃদ্ধি পেলে তরল হতে উত্থিত বাষ্পীয় অণুকে ঐ চাপের বিরুদ্ধে কাজ করে বের হতে হয়। ফলে অণুগুলো উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তেজিত হয় এবং তরল পদার্থের স্ফুটনাঙ্ক স্বাভাবিক স্ফুটনাঙ্ক অপেক্ষা বেশি হয়। কিন্তু চাপ কমালে স্ফুটনাঙ্ক কম হয় কারণ চাপ কমালে তরল হতে উত্থিত বাষ্পীয় অণু পূর্ব অপেক্ষা কিছু মুক্ত থাকে। ফলে অণুগুলো অপেক্ষাকৃত কম তাপমাত্রায় উত্তেজিত হয়ে তরল হতে বের হয়ে যায় এবং তরল পদার্থের স্ফুটনাঙ্ক স্বাভাবিক স্ফুটনাঙ্ক অপেক্ষা কম হয়। চাপের প্রভাবে তরলের স্ফুটনাঙ্কের যে পরিবর্তন ঘটে ‘তা নিম্নে পরীক্ষার সাহায্যে দেখানো হল :

(খ) ফ্রাঙ্কলিন-এর পরীক্ষা (Franklin’s experiment) ঃ একটি গোলতলী ফ্লাস্কের অর্ধেক পানি দ্বারা পূর্ণ করি এবং একটি বার্নারের সাহায্যে উত্তপ্ত করি। পানি উত্তপ্ত করায় পানি ফুটতে থাকবে এবং ফ্লাস্কের মুখ দিয়ে বাষ্প বের হবে। ফলে ফ্লাস্কের মধ্যে যে বায়ু থাকে তা বের হয়ে আসে, যখন সম্পূর্ণ বায়ু ফ্লাস্ক হতে বের হয়ে যায় তখন বার্নারটি তাড়াতাড়ি সরিয়ে ফ্লাঙ্কের মুখ ছিদ্রযুক্ত কর্ক দ্বারা বন্ধ করে ছিদ্রের মধ্যে একটি থার্মোমিটার ঢুকানো হয়।
এখন ফ্লাস্কটি উল্টা করে একটি স্ট্যান্ডের সাথে আটকানো হয়। এ অবস্থায় স্ফুটন বন্ধ হয়ে যাবে এবং থার্মোমিটারের তাপমাত্রা 100° সেলসিয়াস হতে ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। এখন ফ্লাস্কের উপর বরফ গলা পানি (0° সেলসিয়াস) ঢাললে দেখা যাবে, পানি আবার ফুটতে শুরু করেছে এবং থার্মোমিটারে দেখা যাবে তাপমাত্রা স্ফুটনাঙ্কের নিচেই।
ব্যাখ্যা ঃ ফ্লাস্কে ঠান্ডা পানি ঢালায় ফ্লাস্কের ভিতরস্থ জলীয় বাষ্পের বেশ কিছু অংশ তরলে রূপান্তরিত হয় এবং বাষ্পের চাপ কমে যায়, ফলে পানির স্ফুটনাঙ্ক হ্রাস পায়। তাই ফ্লাস্কের পানির তাপমাত্রা যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ নিম্নচাপের স্ফুটনাঙ্কের সমান বা উপরে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ পানি পুনরায় ফুটতে থাকবে।

সুতরাং প্রমাণিত হল যে, তরলের উপর চাপ কমালে তার স্ফুটনাঙ্ক কমে যায়।
উপর চাপের প্রভাবের কয়েকটি বাস্তব ঘটনা (Some real events regarding the influence pressure on boiling point) ঃ
১। সুউচ্চ পর্বতের উপর রান্না করা কষ্টকরঃ পৃথিবীর পৃষ্ঠে বায়ুর চাপ সবচেয়ে বেশি। তাই পৃথিবীর পৃষ্ঠে পানি স্ফুটনাঙ্ক সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ 100° সেলসিয়াস। কিন্তু পৃথিবী হতে যত উপরে উঠা যায় তত বায়ুর চাপ কমে যায়, স্ফুটনাঙ্ক হ্রাস পায়। সুউচ্চ পর্বতে বায়ুর চাপ পৃথিবীর বায়ুর চাপ অপেক্ষা কম বিধায় পর্বতের উপর পানির স্ফুটনাঙ্ক তাই পর্বতের উপর পানি কম তাপমাত্রায় ফুটে থাকে। সুতরাং পর্বতের উপর পানির স্ফুটনাঙ্ক কম হওয়ায় খোলা পারে খাদ্যদ্রব্য সহজে সিদ্ধ প্যাডের ফেসানী হয় না। ফলে রান্না করতে বেশ কষ্ট হয় এবং অনেক সময় লাগে।
২। পেশিনের ডাইজেস্টার বা প্রেসার কুকার ঃ1681 সালে ডেনিস পেপিন নামে একজন ফরাসি বিজ্ঞানী প্রেসার কুকার আবিষ্কার করেন। এটি একটি মোটা অ্যালুমিনিয়ামের দেওয়াল বিশিষ্ট পাত্র এবং একটি রবার প্যাডের সাহায্যে পাত্রের মুখে বায়ু নিরুদ্ধভাবে একটি ঢাকনা লাগানো থাকে। ঢাকনিতে একটি ছিদ্র থাকে। ছিদ্রটি একটি পিন ভালভ দ্বারা বন্ধ থাকে। ভেতরের চাপ প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়ে গেলে এই দিন ভালভ খুলে দিলে বাষ্প বের হয়ে যায়। এছাড়া একটি নিরাপদ ভালভ লাগানো থাকে।

এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। ঢাকনি ও পাত্রের সাথে তাপ কুপরিবাহী পদার্থের হাতল যুক্ত থাকে। ভেতরে পানি ভরে ঢাকনি বায়ু নিরুদ্ধভাবে বন্ধ করে ভেতরের জলীয় বাষ্প সম্পৃক্ত হয় এবং চাপ দেয়। তাপ প্রয়োগ করলে অধিক পরিমাণ পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয় এবং চাপ বৃদ্ধি পায়। ফলে পানির স্ফুটনাঙ্ক বৃদ্ধি পায়।
এভাবে পানির স্ফুটনাঙ্ক 120 সেলসিয়াস বা অধিক আনা হয়। তাপমাত্রা বেশি থাকায় এর মধ্যে যে-কোনো খাদ্যদ্রব্য সহজেই সিদ্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে প্রেসার কুকার বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। যেমন- রান্নার কাজে, ডাক্তারদের যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার জন্য, রাসায়নিক পদার্থের অধিক তাপে রাসায়নিক বিক্রিয়া করানোর ক্ষেত্রে, পাহাড়িয়া অঞ্চলে রান্নার ক্ষেত্রে ইত্যাদি ।

3 thoughts on “গলনাঙ্ক এবং স্ফুটনাঙ্কের উপর চাপের প্রভাবের বর্ণনা | পদার্থের তাপ ধারণ ক্ষমতা | পদার্থবিজ্ঞান”