আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ পৃথিবীর চৌম্বক উপাদান । যা বাউবি এইচএসসি ২৮৭১ পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্র ইউনিট ৫ চুম্বকত্ব এর অন্তর্ভুক্ত।

পৃথিবীর চৌম্বক উপাদান
ভূ-চুম্বকত্বের উপাদান (Elements of geomagnetism)
কোনো স্থানের ভূ-চুম্বকত্বের সঠিক পরিচয় ও পরিমাপের জন্য অর্থাৎ ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্যের মান এবং দিক নির্ণয়ের জন্য যে সব রাশির মান জানা দরকার তাদের ভূ চৌম্বকত্বের উপাদান বা মূল রাশি বলে।
ভূ-চুম্বকত্বের উপাদান মোট তিনটি; যথা-
১) বিচ্যুতি কোণ (Declination)
২) বিনতি কোণ (Angle of Dip or inclination) এবং
৩) ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের অণুভূমিক প্রাবল্য (Horizontal intensity of the earth’s magnetic field) এখন এ তিনটি রাশি বিশদভাবে আলোচনা করা হবে।
১) বিচ্যুতি কোণ (Declination)
কোনো একটি চুম্বককে ভারকেন্দ্র দিয়ে মুক্তভাবে ঝুলিয়ে রাখলে ভৌগোলিক মধ্যতলের সাথে তার মধ্যতল মিলে যায় না। একটি মধ্যতল অন্য মধ্যতলকে ছেদ করে। ফলে তাদের মধ্যে একটি কোণ উৎপন্ন হয়। এই কোণকে ঐ স্থানের ভূ চুম্বকত্বের বিচ্যুতি কোণ বা চ্যুতি বলে । একে সংক্রমণ কোণও বলা হয়।
পৃথিবীর কোনো স্থানে চৌম্বক মধ্যতল এবং ভৌগোলিক মধ্যতলের মধ্যবর্তী কোণকে ঐ স্থানের ভূ-চুম্বকত্বের বিচ্যুতি কোন বা বিচ্যুতি বলে। একে 6 দ্বারা প্রকাশ করা হয় ও ডিগ্রীতে মাপা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিচ্যুতি কোণ বিভিন্ন ।
চিত্রে o স্থানে AODC তল দ্বারা ভৌগোলিক মধ্যতল ও BODC তল দ্বারা চৌম্বক মধ্যতল নির্দেশ করা হয়েছে। কাজেই ZAOB ঐ স্থানের বিচ্যুতি।
কোনো স্থানে সূচি চুম্বকের উত্তর মেরু ভৌগোলিক অক্ষের সাথে ৪ কোণে পূর্বে থাকলে ঐ স্থানের বিচ্যুতি কোণকে ৪°E বা ৪° পূর্ব সংক্ষেপে পূ. এবং ৪ কোণে পশ্চিমে থাকলে ঐ স্থানের বিচ্যুতি কোণকে °w বা ৪° পশ্চিম সংক্ষেপে প. লেখা হয় ।

উদাহরণ:
মনে করি ঢাকার বিচ্যুতি কোণ (2)° পূর্ব। উক্ত উক্তি দ্বার।বুঝা যায় যে, ঢাকায় মুক্তভাবে নড়নক্ষম কোনো সূচি চুম্বকের চৌম্বক অক্ষ চৌম্বক মধ্যতল থেকে ভৌগোলিক অক্ষের সাথে কোণ উৎপন্ন করে এবং এর উত্তর মের 10 ভৌগোলিক অক্ষের পূর্ব দিকে থাকে।
২) বিনতি কোণ (Angle of Dip or inclination)
একটি কাঠের দন্ডকে এর ভারকেন্দ্র হতে পাকহীন সূতার সাহায্যে ঝুলিয়ে রাখলে এর অক্ষ অনুভূমিকভাবে অবস্থান করে (চিত্র ৫.২১)। কিন্তু একটি চুম্বক কিংবা চৌম্বক শলাকাকে এর ভারকেন্দ্র হতে পাকহীন সুতার সাহায্যে ঝুলিয়ে দিলে তার চৌম্বক অক্ষ অনুভূমিকভাবে অবস্থান করে না, বরং অনুভূমিক তলের সাথে কিছু কোণ করে থাকে (চিত্র ৫.২৩)। এই কোণকে বিনতি কোণ বলে।
পৃথিবীর কোন স্থানে ভারকেন্দ্র দিয়ে মুক্তভাবে ঝুল চুম্বকের চৌম্বক অক্ষ অনুভূমিকের সাথে যে কোণ উৎপন্ন করে স্থির থাকে, তাকে ঐ স্থানের ভূ চুম্বকত্বের বিনতি কোণ বা বিনতি বলে। একে 8 দ্বারা প্রকাশ করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের বিনতি কোণ বিভিন্ন। যদি ঝুলড্ দন্ড চুম্বকের ভৌগোলিক উত্তর মের“র দিকে ক্রমশ নিয়ে যাওয়া হয় তবে দন্ড চুম্বকের উত্তর মের— অনুভূমিকের সাথে ক্রমশ বেশি কোণ করে নিচে অবস্থান করবে এবং এসব ক্ষেত্রে বিনতি কোণ 8°N বা ৪° উত্তর বা ৪°উ লিখতে হবে।
আবার ভৌগোলিক দক্ষিণ মের দিকে নিয়ে গেলে দন্ড চুম্বকের দক্ষিণ মের← অনুভূমিকের সাথে ক্রমশ বেশি কোণে হেলে নিচে থাকবে। এ সব অবস্থানের বিনতি কোণ 8°s বা ৪° দক্ষিণ বা 8° দ. লিখতে হবে। দুই মের—তে বিনতি 90° এবং বিষুবরেখার বিনতি 0° হয়।
এখন প্রশ্ন জাগে বিষুবরেখায় ছাড়া অন্যত্র মুক্তভাবে ঝুলড্ চুম্বকের চৌম্বক অক্ষ অনুভূমিক তলে থাকে না কেন? পৃথিবী একটি বিরাট চুম্বক। সুতরাং ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্যের একটি দিক আছে। বিষুবরেখায় ছাড়া অন্যত্র তা অনুভূমিকের সাথে হেলে থাকে। মুক্তভাবে ঝুলড্ চুম্বক ভূ-চুম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্যের দিক অনুযায়ী নিজকে স্থাপন করে বলে ঝুলড্ চুম্বক অনুভূমিক তলে না থেকে তলের সাথে কিছু কোণ করে অবস্থান করে ।

চিত্রে O স্থানে OB রেখা ভূ-চৌম্বক অক্ষ বরাবর অবস্থিত। ওই স্থানে মুক্তভাবে ঝুলড্ চুম্বকের চৌম্বক অক্ষ OP বরাবর অবস্থান করলে ∠BOP = 8 ঐ স্থানের বিনতি।
উদাহরণ: ঢাকার বিনতি কোণ 31°N বলতে বুঝায়, ঢাকায় একটি দন্ড চুম্বককে মুক্তভাবে তার ভারকেন্দ্র হতে ঝুলালে দন্ড চুম্বকটির উত্তর মের— অনুভূমিকের নিচের দিকে ঝুলে স্থির থাকবে এবং চুম্বকের চৌম্বক অক্ষ অনুভূমিক তলের সাথে 31° কোণ উৎপন্ন করবে।
৩) ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের অণুভূমিক প্রাবল্য (Horizontal intensity of the earth’s magnetic field)
পৃথিবীর কোন স্থানে একটি একক মের শক্তির উত্তর মের“র উপর ভূ-চুম্বকত্বের দরন যে বল ক্রিয়া করে তাকে ওই
স্থানের ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্য বা মোট প্রাবল্য বলে ।
কোনো স্থানে ভারকেন্দ্র দিয়ে মুক্তভাবে ঝুলড্ চুম্বক ওই স্থানের ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্যের দিক নির্দেশ করে। মনে করি কোনো স্থানে ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্য (i), এ প্রাবল্য (1) কে দুটি উপাংশে ভাগ করা যায়। একটি অনুভূমিক উপাংশ (H) এবং অপরটি উলম্ব উপাংশ (V) (চিত্র ৫.২২)। এ অনুভূমিক উপাংশকে ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের অনুভূমিক প্রাবল্য এবং উলম্ব উপাংশকে ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের উলম্ব প্রাবল্য বলে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এদের মান বিভিন্ন হয় ।

কোনো স্থানের ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্যের অনুভূমিক উপাংশকে ওই স্থানের ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের অনুভূমিক প্রাবল্য এবং উলম্ব উপাংশকে ঐ স্থানের ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের উলম্ব প্রাবল্য বলে।
বর্ণনা অনুসারে,
H = I cos 8 ……………(1)
এবং V = I sin 8 …………………(2)
এখানে 8 = বিনতি কোণ
সমীকরণ (1) এবং সমীকরণ (2) এর বর্গ যোগ করে পাই,
I2cos28 + I2sin28 = H2 + v2
বা, I2 (cos 2 8 + sin2 8) = H2 + v2
বা, I2 = H2 + v2
.. I = √(H² + V2) …………………(3)
আবার, সমীকরণ (2) কে সমীকরণ (1) দ্বারা ভাগ করে পাই,
(I sin8)/(I cos 8) = V/H
বা, tan8 = V/H …………………(4)
8 = tan-1(V/H) …………………(5)
সমীকরণ (5) হতে পাই, V = H tan 8
বা, V/H = 1/tan8 = cot 8 …………………(6)
H = V cot 8
[বি.দ্র: যদি ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্য i এর পরিবর্তে ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্র Ē ব্যবহার করা হয় তবে উপরের সীকরণগুলোতে I এর স্থলে B বসাতে হবে। তখন চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্যের অনুভূমিক উপাংশ এবং উলম্ব উপাংশ যথাক্রমে চৌম্বক ক্ষেত্রের অনুভূমিক উপাংশ এবং উলম্ব উপাংশ হবে এবং একক Am” এর স্থলে Tesla (T) বা weber/m2 হবে।]
উদাহরণ:
মনে করি রাজশাহীতে ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের অনুভূমিক প্রাবল্য H=29 Am-1 পরিমাপ করা হয়েছে। এ উক্তির অর্থ রাজশাহীতে –
ক) ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্যের অনুভূমিক উপাংশের মান H=29 Am-1।
খ) এক ওয়েবার মেরশক্তির উত্তর মের= ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের জন্য অনুভূমিক বরাবর 29 N বল অনুভব করবে।
গ) রাজশাহীতে বিনতি কোণ ১ হলে ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের উলম্ব প্রাবল্য V=29 tan 8 ও মোট প্রাবল্য I=29 sec 6। পৃথিবীর চুম্বক মের—তে ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের কোনো অনুভূমিক প্রাবল্য নেই। চৌম্বক বিষুবরেখায় এর মান সৰ্বাধিক 30 Am-1 হতে 32 Am-1 এর মধ্যে।
ঢাকার বিনতি কোন 31° হলে, ঢাকায় ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্যের উলম্ব ও অনুভূমিক উপাংশের অনুপাত tan 31°N এর
সমান।

গাণিতিক উদাহরণ
১। কোনো স্থানে ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের অনুভূমিক উপাংশের মান 89 NWb’ এবং বিনতি 60°। ওই স্থানের ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের উলম্ব উপাংশের মান নির্ণয় করন।
এখানে,
H = 89 NWb-1
8 = 60°
V = ?
আমরা জানি,
V=H tan 8
= 89 tan 60°
= 154.15 NWb-1
উ: 154.15 NWb -1
২ । কোনো স্থানে H = 36 μT এবং বিনতি 45° । ওই স্থানের ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্র নির্ণয় করন।
এখানে,
H = 36 μT
= 36×10-6T
8 = 45°
I = ?
আমরা জানি,
H = I cos 8
বা, 36×10-6 = I cos 45°
বা, I = (36×10-6/cos 45°)
= 36×10-6/(1/√2)
= 36×10-6 × √2
= 50.911×10-6 T
= 50.911uT
উ: 50.911μT
৩। কোনো স্থানে ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের অনুভূমিক প্রাবল্য 32 Am-1 এবং উলম্ব প্রাবল্য 24 Am-1। ওই স্থানে ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের মোট প্রাবল্য এবং বিনতি কোণ নির্ণয় করন।
এখানে,
H = 32 Am-¹
V = 24 Am-¹
I=?
8 = ?
মনেকরি, মোট প্রাবল্য = I
আমরা পাই,
I = √(H² + V2) ……………(1)
এখন
tan 8 = V/H ……………(1)
সুতরাং, (1) হতে পাই, I = √(322 + 242) = 40 Am-¹ এবং (2) হতে পাই, tan 8 = V/H = 24/32 = 0.75 = tan 36°52′
:. নির্ণেয় বিনতি কোণ, 8 = tan 36°52′
উ: tan 36°52′

সার-সংক্ষেপ :
বিচ্যুতি কোণ (Declination):
কোনো একটি চুম্বককে ভারকেন্দ্র দিয়ে মুক্তভাবে ঝুলিয়ে রাখলে ভৌগোলিক মধ্যতলের সাথে তার মধ্যতল মিলে যায় না। একটি মধ্যতল অন্য মধ্যতলকে ছেদ করে। ফলে তাদের মধ্যে একটি কোণ উৎপন্ন হয়। এই কোণকে ঐ স্থানের ভূ-চুম্বকত্বের বিচ্যুতি কোণ বা চ্যুতি বলে। একে সংক্রমণ কোণও বলা হয়।
বিনতি কোণ (Angle of Dip or inclination) :
পৃথিবীর কোন স্থানে ভারকেন্দ্র দিয়ে মুক্তভাবে ঝুলড্ চুম্বকের চৌম্বক অক্ষ অনুভূমিকের সাথে যে কোণ উৎপন্ন করে স্থির থাকে, তাকে ঐ স্থানের ভূ-চুম্বকত্বের বিনতি কোণ বা বিনতি বলে। একে ৪ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের বিনতি কোণ বিভিন্ন ।
ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের অণুভূমিক প্রাবল্য (Horizontal intensity of the earth’s magnetic field):
পৃথিবীর কোন স্থানে একটি একক মেরশক্তির উত্তর মের“র উপর ভূ-চুম্বকত্বের দরন যে বল ক্রিয়া করে তাকে ওই স্থানের ভূ- চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্য বা মোট প্রাবল্য বলে।
বহুনির্বাচনী প্রশ্নঃ
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন
১। চৌম্বক মধ্যতল ও ভৌগোলিক মধ্যতলের মর্ধবর্তী কৌনিক ব্যবধানকে বলে-
(ক) বিচ্যুতি
(খ) বিনতি
(গ) বিলম্ব কোণ
(ঘ) চৌম্বক কোণ
২। কোনো স্থানের বিনতি কোন ¢ হলে, ঐ স্থানের ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের অনুভূমিক ও উলম্ব উপাংশের অনুপাত কত?
(ক) sinφ
(খ) cosφ
(গ) tanφ
(ঘ) cotφ
