মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষা 

আজকে আমরা মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষা সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা বাউবি এইচএসসি ২৮৭১ পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্র ইউনিট ৮ এর  আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এর অন্তর্ভুক্ত।

 

মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষা 
মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষা

 

মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষা

যদি আলো শূন্য মাধ্যমে ইথারের মধ্য দিয়ে c বেগে সঞ্চালিত হয় তবে আলোর উৎসের দিকে বা তার বিপরীত দিকে, সমবেগে গতিশীল পর্যবেক্ষকের নিকট আলোর আপেক্ষিক বেগ cr = c±v |

সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর কক্ষীয় বেগ প্রায় 30.1kms-1 । যদি ইথারকে সূর্যের সাপেক্ষে স্থির ধরা হয় তবে পৃথিবী ইথারের মধ্য দিয়ে এই বেগে গতিশীল। তাহলে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত্ একটি আলোক তরঙ্গ উত্তর-দক্ষিণ বরাবর যাওয়া আসা করাতে প্রয়োজনীয় সময় এবং একই দূরত্ব পূর্ব-পশ্চিম বরাবর যাওয়া আসা করতে সময় সঠিকভাবে পরিমাপ করে এই সময়ের পার্থক্য থেকে ইথারের সাপেক্ষে পৃথিবীর গতি সরাসরি মাপা সম্ভব।

মাইকেলসন মোরলে এই ভাবে আলোর সাহায্যে ইথারের অস্থিত্ব নিরূপণ করার চেষ্টা করেন। মাইকেলসন ও মোরলের পরীক্ষার মূল নীতি ছিল মাইকেলসন ইন্টারফেয়ারোমিটারকে আদি অবস্থান থেকে 90° কোণে ঘোরালে ব্যতিচার ডোরার কোনো সরণ ঘটে কিনা। তবে শর্ত হলো এই যন্ত্রের একটি বাহুতে আলোক রশ্মি পৃথিবীর কক্ষীয় গতির দিকে থাকবে ।

যন্ত্রের বর্ণনা ঃ-

মাইকেলসন ইন্টারফেয়ারোমিটার চিত্রে দেখানো হলো। M, ও M2 দুটি সমতল দর্পণ যার সম্মুখ ভাগ অর্ধ রৌপ্য প্রলেপ যুক্ত । দর্পণ দুটি পরস্পরের সাথে সমকোণে অবস্থিত দুটি বাহুর শেষ প্রাড়ে উলম্ব ভাবে সংযুক্ত। ফলে দর্পণ দুটিও পরস্পরের সাথে সমকোণে অবস্থিত। G হলো অর্ধ রৌপ্য প্রলেপ যুক্ত সমতল কাচ পাত।

এটি উলম্ব ভাবে SM, এর সাথে 45° কোণে স্থাপিত। যেন OM এবং OM, এর আলোক পথ সমান হয় সেজন্য OM, এর আলোক পথে G সমতল কাচ পাত এর পুরত্বের সমান পুরীত্বের এবং এর সমাালে একটি কাচ পাত Gi স্থাপন করা হয়। S একটি একবর্ণী আলোক উৎস যা উত্তল লেন্সের ফোকাসে অবস্থিত। ব্যাতিচার ডোরা দেখার জন্য টেলিস্কোপ T। পারদ পূর্ণ একটি ভারী পাত্রে সমগ্র যন্ত্রটিকে ভাসিয়ে রাখা হয় যেন কেন্দ্রীয় অক্ষের সাপেক্ষে বিনা বাধায় ঘোরানো যায়।

 

মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষা 
মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষা

 

তত্ত্ব ঃ-

লেন্সের মধ্য দিয়ে এক গুচ্ছ সমাাল একবর্ণী আলোক রশ্মি G সমতল কাচ পাতের O বিন্দুতে আপতিত হয়ে দুটি অংশে বিভক্ত হয়। একটি প্রতিফলিত এবং অপরটি সমপ্রাবল্যের প্রতিসরিত রশ্মি। এই প্রতিফলিত এবং প্রতিসরিত রশ্মি পরস্পর সমকোণে OM ও OM, পথে M, ও M2 দর্পণে লম্বভাবে আপতিত হয়। দর্পণদ্বয় হতে প্রতিফলিত হয়ে MOও MO রশ্মিদ্বয় G সমতল কাঁচ পাত দিয়ে যথাক্রমে প্রতিসরিত ও প্রতিফলিত হয়ে O বিন্দুতে ফিরে এসে উভয়ই OE পথে সঞ্চালিত হয়।

উভয় আলোক রশ্মি সমপুরত্বের G ও G কাচের ভিতর দিয়ে দুইবার প্রতিসরিত হয় বলে তাদের আলোকীয় পথ সমান থাকে। যেহেতু M, ও M2 দর্পণ সম্পূর্ণরূপে পরস্পরের সাথে সমকোণে থাকেনা বলে টেলিস্কোপ T তে ব্যাতিচারের ফলে সমাাল অন্ধকার ও উজ্জ্বল ডোরার সৃষ্টি হয়। মাইকেলসন তার যন্ত্রে দর্পণ দুটিকে এমন ভাবে স্থাপন করেছিলেন যেন OMG = OM2=1 হয়। আমরা ব্যাখ্যার সুবিধার জন্য ধরি, OM1 = l1, এবং OM2 = l2 যেন l1 = l2 = l হয়।

যদি সমগ্র যন্ত্রটি ইথারের সাপেক্ষে স্থির থাকতো তবে দুটি আলোক রশ্মি একই সাথে O বিন্দুতে ফিরে আসতো। মনে করি স্থির ইথারে আলোর বেগ c। ধরি যন্ত্রটিকে এমন ভাবে স্থাপন করা হয়েছে যেন S থেকে M, দর্পণের দিকে আলোর রশ্মি পৃথিবীর কক্ষীয় পথের সমাালে আছে। তাহলে আলোক রশ্মি OM, পথে গমন করে যখন প্রতিফলিত হচ্ছে তখন M, দর্পণটি M¥ অবস্থানে এবং যখন প্রতিফলিত হয়ে G অর্ধ রূপার প্রলেপ যুক্ত কাঁচ পাতে ফিরে আসে তখন এটি G’ অবস্থানে ।

সুতরাং যন্ত্রের সাপেক্ষে OM1 বরাবর আলোর বেগ, c+v এবং যন্ত্রের সাপেক্ষে M1’O’ বরাবর আলোর বেগ c – v অতএব আলোক রশ্মির M1O+ M1’O’ পথ অতিক্রম করতে প্রয়োজনীয় সময়,

t1 = l1/( c+v) + l2/( c-v) = 2l1c/(c²-v2) = 2l1/c(1/1-v2/c2) …………………….(1)

S থেকে M2 দর্পণের দিকে আলোক রশ্মি পৃথিবীর কক্ষীয় পথের লম্ব ভাবে আছে। তাহলে আলোক রশ্মি OM পথে গমন করে তখন M2 দর্পণটি vt দূরত্ব সরে গিয়ে M½ অবস্থান নেয় এবং M2 দর্পণ থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসার পথে আরো vt দূরত্ব সরে G’ অর্ধ রূপার প্রলেপ দর্পণের O’ অবস্থানে পৌচ্ছে। সুতরাং লম্ব পথে যাওয়া আসার সময়,

t2=t+t

এখন, চিত্রানুসারে, = 1/200′ = OP এবং OM2’2 = OP2 + PM2’2

আবার, OP =vt এবং OM2′ = ct এবং PM’2 = l2,

তাহলে, c²t² = v²t² +l2²

বা, t²(c²-v²)=122

বা, t = l2/√(c²-v2)

বা, t = l2/c{1/√(1-v2/c2)}

অতএব, 2t = 2l2/c{1/ 1√(1-v2/c2)}

বা, t2 = 2l2/c{1/ 1√(1-v2/c2)} …………………….(2)

সুতরাং দুই পথে আলো যাওয়া আসার সময়ের পার্থক্য,

t=t1-t₂ =2l2/с (1-v2/c2) -2l2/c {1/ 1√(1-v2/c2)} …………………….(3)

 

মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষা 
মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষা

 

এখন সমগ্র যন্ত্রটি 90° কোণে ঘোরালে M1 ও M2 দুটি অবস্থান পরিবর্তন করবে। সুতরাং এই অবস্থানে আলো যাওয়া আসার সময়ের পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য (3 নং) সমীকরণে l1 এর স্থলে l2 এবং l2 এর স্থলে l1 বসিয়ে পাই,

t’ = t’1 – t’ =2l2/с (1-v2/c2) -2l2/c {1/ 1√(1-v2/c2)}

তাহলে মোট সময়ের পার্থক্য,

δt = t+At’= 2l1/C{1/(1-v2/c2)} – 2l2/C{1/√(-v2/c2)} + 2l2/C{1/(1-v2/c2)} – 2l2/C{1/√(1 -v2/c2)}

বা, δt = 2/c{1/(1-v2/c2)}(l1+l2) – 2/c{1/√(1 -v2/c2)}(l1+l2)

বা, δt = 2/c (l1+l2)[(1-v2/c2)-1 – (1-v2/c2)-1/2]

যেহেতু v2/c2 <<1 সূতরাং এর উচ্চঘাত বর্জন করে লিখা যায়,

δt = 2/c(l1+l2)[(1+v2/c2) – (1+1/2v2/c2)]

বা, δt = 2/c(l1+l2)[1+v2/c2 -1+ 1/2v2/c2]

বা, δt = 2/c(l1+l2) x 1/2v2/c2 = v2/c3(l1+l2)

এখন, l1 = l2 = l বসালে,

δt = 2v²l/c3 = v2/c2 × 2l/c

বা, cδt = v2/c2 × 2l …………………….(4)

δt সময়ে রশ্মিদ্বয়ের আলোকীয় পথ পার্থক্য d হলে,

d = cδt = v2/c2 × 2l …………………..(5)

যদি পরীক্ষায় ব্যবহৃত আলো তরঙ্গদৈর্ঘ্য λ হয় তবে ব্যতিচারের শর্তানুসারে পথ পার্থক্য,

d = nλ = v2/c2 × 2l এখানে n হলো ডোরার সরণ।

n = v2/c2 × 2l/λ …………………..(6)

মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষার প্রাপ্ত ফলাফল ও বিশেষণ

মাইকেলসন মোরলে ডোরার সরণ সূক্ষ্ম ও সঠিক ভাবে পরিমাপের জন্য l=11m, a=5.5x107m এবং v = 30.1km = 30.1×10 m ব্যবহার করেন।

এই মানগুলো বসালে, n = (30.1×103)2× (3×108)2 =( 2×11 )/(5.5×10-7) = 0.4

সুতরাং প্রথম অবস্থান থেকে সমগ্র যন্ত্রটি 90° কোণে ঘোরালে 0.4 সংখ্যক ডোরার সরণ হবার কথা। কিন্তু পরীক্ষা লব্ধ ফল থেকে দেখা গেল যে, সমগ্র যন্ত্রটি বারবার 90° কোণে ঘোরালে ডোরার কোনো সরণ ঘটছে না। অথচ তাঁর যন্ত্রে 1 /100 অংশ সরণও পরিমাপ করা যেত।

মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষণের পর প্রায় ৫০ বছর ধরে বিভিন্ন বিজ্ঞানীকগণ দিনে ও রাতের বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন অক্ষাংশে, বিভিন্ন ঋতুতে পরীক্ষা সম্পাদন করেন এমনকি মহাকাশেও এই পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয় এবং একই ফল পান। এই ঋণাত্মক ফলাফল থেকে সিদ্ধার্ল্ডে উপনিত হন যে, ”ইথারের সাপেক্ষে পৃথিবীর বেগ শূন্য”। অর্থাৎ ইথার নামক কল্পিত পদার্থের কোন অস্তিত্ব নাই। এছাড়া আরো প্রমাণিত হয় যে আলোর বেগ পরম বেগ।

মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষার ঋণাত্মক ফলাফল গ্যালিলিও এর বেগ রূপান্ত্র সূত্র অকার্যকর করে দেয়। হাইগেনসের ইথার মাধ্যমে আলোর তরঙ্গ মতবাদের মৃত্যু ঘটে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের দ্বিতীয় সূত্রের সত্যতা প্রমাণিত হয়।

 

মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষা 
মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষা

 

সার-সংক্ষেপ :

মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষার ঋণাত্মক ফলাফল গ্যালিলিও এর বেগ রূপান্ত্র সূত্র অকার্যকর করে দেয়। হাইগেনসের | ইথার মাধ্যমে আলোর তরঙ্গ মতবাদের মৃত্যু ঘটে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের দ্বিতীয় সূত্রের সত্যতা প্রমাণিত হয়।

বহুনির্বাচনী প্রশ্নঃ

১। মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষায় সমতল দর্পণ দুটির মধ্যে একটির আলোক পথের মাঝে একটি কাচফলক রাখা হয় কেন?

ক. আলোর পথ পরিবর্তনের করার জন্য

খ. আলোকীয় পথ সমান করার জন্য

গ. আলোর ব্যাতিচার ঘটানোর জন্য

ঘ. আলোর অপবর্তন দূর করার জন্য

২। মাইকেলসন মোরলে পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে,

i. আলোর বেগ পরম বেগ

ii. এক প্রকার তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ

iii. ইথারের কোনো অস্তিত্ব নাই

নীচের কোনটি সঠিক?

ক. i ও ii

খ. ii ও iii

গ. i ও iii

ঘ. i, ii ও iii

Leave a Comment