থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি বর্ণনা

থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি বর্ণনা – পাঠটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এর পলিটেকনিক এর “পদার্থবিজ্ঞান ২” বিষয়ের “থার্মোমিতি ” অধ্যায়ের একটি পাঠ।  পদার্থবিজ্ঞান পদার্থ ও তার গতির বিজ্ঞান। বাংলায় “পদার্থবিজ্ঞান” শব্দটি একটি সমাসবদ্ধ পদ। “পদার্থ” ও “বিজ্ঞান” দুটি সংস্কৃত শব্দ নিয়ে এটি গঠিত। এর ইংরেজি পরিভাষা Physics শব্দটি গ্রিক φύσις (ফুঁসিস) অর্থাৎ “প্রকৃতি”, এবং φυσικῆ (ফুঁসিকে) অর্থাৎ “প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞান” থেকে এসেছে। পদার্থবিজ্ঞান বলতে বলা যেতে পারে এটা হলো গণিতের বাস্তব রূপ।

বিভিন্ন ধরনের থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি বর্ণনা

একটি সাধাণ থার্মোমিটারের সাহায্যে কোনো বস্তুর যে-কোনো সময়ের তাপমাত্রা নির্ণয় করা যায়। কিন্তু এ সকল থার্মোমিটার দিয়ে কোনো বস্তু বা অবস্থানের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নির্ণয় করতে হলে 24 ঘণ্টায় তাপমাত্রার তালিকা প্রস্তুত করতে হয়। এটি খুবই কষ্টকর ব্যাপার। আবহাওয়া অফিসে, গবেষণাগারে, কৃষিকাজে দিনের সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা জানার প্রয়োজন হয়। এ কাজের জন্য এমন থার্মোমিটারের প্রয়োজন হয় যা দিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নির্দেশ করে।

যে থার্মোমিটার নির্দিষ্ট সময়ের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নির্দেশ করে তাকে চরম থার্মোমিটার (Maximum thermometer) বলে এবং যে থার্মোমিটার নির্দিষ্ট সময়ের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নির্দেশ করে তাকে অবম থার্মোমিটার (Minimum thermometer) বলে।

 

নিচে চরম ও অবম থার্মোমিটারের গঠন ও কার্যপ্রণালি বর্ণনা করা হল : 

 

১। রাদারফোর্ডের চরম ও অবম থার্মোমিটার (Rutherford’s maximum and minimum thermometer) :

চরম থার্মোমিটার গঠন : রাদারফোর্ডের চরম থার্মোমিটার একটি পারদ থার্মোমিটার। এতে একটি বাল্‌ব B এবং নলের মধ্যে একটি ডাম্বেলের ন্যায় ইস্পাতের সূচক P থাকে। থার্মোমিটারটি একটি কার্য বা ধাতব ফ্রেমের সাথে আনুভূমিকভাবে স্থাপন করা হয় যাতে সূচকটি নলের মধ্যে যে-কোনো স্থানে স্থিরভাবে থাকতে পারে। নলের সাথে একটি স্কেল লাগানো থাকে ।

 

থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি বর্ণনা
থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি বর্ণনা

 

থার্মোমিটারটি ব্যবহারের পূর্বে একটি শক্তিশালী চুম্বক দিয়ে P সূচকটিকে পারদ স্তম্ভের উত্তল পিঠের সাথে স্পর্শ করে রাখা হয়। 

 

চরম থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি ঃ

তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে পারদ প্রসারিত হয়ে সূচকটি সামনের দিকে ঠেলে দেয়। তাপমাত্রা হ্রাস পেলে পারদ সংকুচিত হয় কিন্তু সূচকটি পূর্বের অবস্থানে থেকে যায়। তাপমাত্রা যত বেশি হবে সূচকটি তত বেশি দূরত্ব অতিক্রম করবে। পারদের দিককার সূচকের প্রান্তের অবস্থানের পাঠই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নির্দেশ করে। 

 

অবম থার্মোমিটারের গঠন ঃ

(চিত্র ঃ ১.৬) এই থার্মোমিটারে পারদের পরিবর্তে অ্যালকোহল ব্যবহার করা হয়। এতে অ্যালকোহলের ভিতর একটি সূচক থাকে। এই সূচকটি অ্যানামেল বা রঙিন কাচ দ্বারা ডাম্বেলের ন্যায় তৈরি করা হয়। এটিও কাঠ বা ধাতব ফ্রেমের সাথে সংযুক্ত থাকে। নলের সাথে একটি স্কেল লাগানো থাকে । 

 

অবম থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি ঃ

থার্মোমিটারটি ব্যবহারের পূর্বে কাঠামোটিকে কাত করে সূচকটি অ্যালকোহলের মধ্যে উন্মুক্ত অবতল পৃষ্ঠে স্পর্শ করা হয়। তাপমাত্রা কমতে থাকলে অ্যালকোহল সংকুচিত হয়। অ্যালকোহলের পৃষ্ঠটানে সূচকটি সরে আসে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে অ্যালকোহল প্রসারিত হয় কিন্তু সূচকটি পূর্বে অবস্থানেই থেকে যায়। অ্যালকোহলের মুক্ততল সংলগ্ন সূচকের পাশ সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নির্দেশ করে ।

 

২। সিক্সের চরম ও অবম থার্মোমিটার (Sixs maximum and minimum thermometer) ঃ 

 

গঠন ; (চিত্র ঃ ১.৭) চরম ও অবম থার্মোমিটার একত্র করে সিক্সের থার্মোমিটার তৈরি করা হয়। U আকৃতির একটি কাচনলের C প্রান্তে একটি বড় বাল্‌ব A এবং B প্রান্তে একটি ছোট বাল্‌ব লাগানো থাকে । A বাল্‌ব ও C নলের কিছু অংশে অ্যালকোহল থাকে। C নলের বাকি অংশ ও B বালবের কিছু অংশে পারদ থাকে। B বালবের বাকি অংশে অ্যালকোহল D বাষ্প পূর্ণ থাকে। C ও B নলের অ্যালকোহলের মধ্যে দুটি ইস্পাতের তৈরি ডাম্বেল আকৃতির সূচক থাকে। U নলের দুই পাশে দু’টি খাড়া তাপমাত্রা স্কেল থাকে। প্রাথমিকভাবে চুম্বক দিয়ে সূচক দু’টি পারদ পৃষ্ঠের সাথে স্পর্শ করে রাখা হয় ।

 

থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি বর্ণনা
থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি বর্ণনা

 

কার্যপ্রণালি ঃ তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে অ্যালকোহলের আয়তন বৃদ্ধি পায়। A বাল্‌বে B বাল্‌ব অপেক্ষা অ্যালকোহল বেশি থাকায় প্রসারিত হয় এবং পারদকে ঠেলে B নলে পাঠিয়ে দেয়। আবার তাপমাত্রা হ্রাস পেলে অ্যালকোহল সংকুচিত হয় এবং পারদ নেমে আসে ও C নলে উপরের দিকে উঠে যায়। B নলের সূচক আগের স্থানে থেকে যায় এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নির্দেশ করে। অপরদিকে তাপমাত্রা হ্রাস পেয়ে C নলের সূচক উপরে উঠে যায়।

 

 

তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে C নলের সূচকটি পূর্ব স্থানে থেকে যায় এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নির্দেশ করে। এক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অ্যালকোহল যতটা প্রসারিত হয় সম আয়তন পারদ সেই অনুপাতে কম প্রসারিত হয়। অ্যালকোহলে এই ধর্মের উপর ভিত্তি করেই সিক্সের থার্মোমিটার কাজ করে।

 

৩। ডাক্তারি থার্মোমিটার (Clinical thermometer):

মানব দেহের তাপমাত্রা মাপার জন্য যে থার্মোমিটার ব্যবহার করা হয় তাকে ডাক্তারি থার্মোমিটার বলে। এটি একটি অত্যন্ত সুবেদী চর পারদ থার্মোমিটার। এটি সাধারণত ফারেনহাইট স্কেলে দাগান্বিত থাকে।

 

গঠন : এই থার্মোমিটারে একটি বালব B থাকে এবং বালনের সাথে একটি সরু ও কৈশিক নল সংযুক্ত থাকে। বালনের ঠিক উপরে C বিন্দুতে একটু বাঁকা থাকে। একে সংকোচ (Constriction) বলা হয়। মানব দেহে স্বাভাবিক তাপমাত্রা 98.4° ফারেন তবে মানব দেহের তাপমাত্রা কোনো ক্রমেই 95° ফারেনহাইটের কম ও 110 ফারেনহাইটের বেশি হতে পারে না।

 

সেজন্য এই থার্মোমিটারের গায়ে 95° ফারেনহাইট থেকে 110° ফারেনহাইট পর্যন্ত দাগ কাটা থাকে এবং প্রতি ডিগ্রি আবার পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়। এক এক ভাগের মান 0.2 ডিগ্রি। তাছাড়া মানব দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা 98.4° ফারেনহাইট তাই 98.4° ফারেনহাইটে বিশেষ দাগ থাকে।

 

কার্যপ্রণালি ঃ থার্মোমিটারটি ব্যবহারের পূর্বে ভালমতো ঝাঁকিয়ে কৈশিক নলে থাকা পারদ বাঁক C এর নিচেই বাল্বরের মধ্যে আনা হয়। এরপর থার্মোমিটারকে শরীরের সংস্পর্শে আনলে শরীরের তাপমাত্রায় পারদ প্রসারিত হয়। ফলে বাঁক অতিক্রম করে পারদ কৈশিক নলের মধ্যে চলে আসে। পারদের তাপমাত্রা ও দেহের তাপমাত্রা সমান হলে, পারদ আর প্রসারিত হয় না অর্থাৎ উপরের দিকে আর উঠে না। পারদ কৈশিক নলে স্থির অবস্থায় থাকে। পরে দেহ থেকে বের করে শরীরের তাপমাত্রা নির্ণয় করা হয়। বাঁক থাকার কারণে পারদ বালবে ফিরে আসতে পারে না, যার ফলে শরীরের সঠিক তাপমাত্রা পাওয়া যায়।

 

থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি বর্ণনা 2
থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি বর্ণনা

 

বর্তমানে ডাক্তারি থার্মোমিটার হিসেবে পূর্বের পারদ থার্মোমিটারের তুলনায় ডিজিটাল থার্মোমিটার ব্যবহার করা হয়। সাধারণত একটি তাপ সংবেদনশীল ধাতু থার্মোমিটারের সামনে লাগানো থাকে, যা মানবদেহের সংস্পর্শে আসলে নির্দিষ্ট সময় পর শরীরের তাপমাত্রা ডিজিটালভাবে প্রদর্শন করে। নিম্নে চিত্র দেয়া হল-

 

এ ধরনের থার্মোমিটারের সুবিধা :

 

১। এটিতে নির্ভুল পাঠ পাওয়া যায়।

২। এটিতে সময় কম লাগে।

৩। এটি সাধারণ লোকজন ব্যবহার করতে পারে।

৪। এটিতে দশমিকসহ পাঠ নেয়া যায়।

৫। এটির ঋতুভেদে তাপমাত্রা পরিবর্তন হয় না ।

 

এ ধরনের থার্মোমিটারের অসুবিধা :

 

১। এটি খুব নিম্ন তাপমাত্রা পরিমাপ করতে পারে না। কারণ এর হিমাংক অনেক বেশি (40°C)।

২। পারদ খুবই বিষাক্ত। যদি পারদের টিউবটি ভেঙ্গে যায় তাহলে এটি খুব ক্ষতিকারক হবে।

৩। পারদের মূল্য অনেক বেশি অর্থাৎ থার্মোমিটারে পারদ ব্যবহার ব্যয়বহুল।

 

থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি বর্ণনা
থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি বর্ণনা

2 thoughts on “থার্মোমিটারের কার্যপ্রণালি বর্ণনা”

Leave a Comment