বিভিন্ন বস্তুর প্রসারণজনিত সমস্যাদির প্রতিবিধান – পদার্থবিজ্ঞান পদার্থ ও তার গতির বিজ্ঞান। বাংলায় “পদার্থবিজ্ঞান” শব্দটি একটি সমাসবদ্ধ পদ। “পদার্থ” ও “বিজ্ঞান” দুটি সংস্কৃত শব্দ নিয়ে এটি গঠিত। এর ইংরেজি পরিভাষা Physics শব্দটি গ্রিক φύσις (ফুঁসিস) অর্থাৎ “প্রকৃতি”, এবং φυσικῆ (ফুঁসিকে) অর্থাৎ “প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞান” থেকে এসেছে। পদার্থবিজ্ঞান বলতে বলা যেতে পারে এটা হলো গণিতের বাস্তব রূপ।
বিভিন্ন বস্তুর প্রসারণজনিত সমস্যাদির প্রতিবিধান
ইঞ্জিনিয়ারিং ও অন্যান্য কারিগরি বিদ্যায় কঠিন পদার্থের প্রসারণ বহুবিধ প্রয়োগ দেখা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কঠিন পদার্থের প্রসারণ যেমন সুবিধার সৃষ্টি করে আবার তেমনি অসুবিধার সৃষ্টি করে। নিচের এর সুবিধা ও অসুবিধার কয়েকটি ঘটনা দেয়া হল ঃ যেমন-
(ক) রেল লাইনের জোড়ার মুখে ফাঁক রাখা হয় কিন্তু ট্রাম লাইনের জোড়ার মুখে ফাঁক রাখা হয় না ঃ রেল লাইনের দু’টি পাতের মধ্যে ফাঁক রাখা হয়। সূর্যের কিরণ ও চাকার ঘর্ষণে লোহা উত্তপ্ত হয়। ফলে লোহার প্রসারণ ঘটে এবং তার জন্য ফাঁক রাখা হয়। আর পাতের মধ্যে যদি কোনো ফাঁক রাখা না হয় তাহলে সূর্যের কিরণ ও চাকার ঘর্ষণের ফলে লোহার প্রসারণ ঘটলে রেললাইন বেঁকে যাবে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটবে।

কোনো স্থানের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা । °C এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছ°C হলে ঐ স্থানে L মিটার দৈর্ঘ্যের সমান দুটি লোহার রেলের সংযোগস্থলে কমপক্ষে Lax (2 – ti) মিটার স্থান ফাঁক রাখতে হবে। এখানে a. লোহার দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক । ট্রাম লাইনে কোনো ফাঁক রাখা হয় না। বিদ্যুৎ প্রবাহ চালু রাখার কারণে মুখে মুখে জোড়া লাগানো হয় । ট্রাম লাইন মাটির ভিতর গাঁথা থাকে এবং গ্রানাইট পাথর ও সিমেন্ট দ্বারা বেষ্টিত থাকে। তাই ট্রাম চলাচলের সময় যে তাপের উৎপত্তি ঘটে তা ঐ পাথর ও সিমেন্টের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাপমাত্রার পার্থক্য খুবই কম হয়। তা ছাড়া কনক্রিটের ঢালায় থাকে বলে ট্রাম লাইন বাঁকতে পারে না।
(খ) ঢাকায় লোহার বেড় বসাতে ঃ সাধারণত ঠেলাগাড়ি বা গরুর গাড়ির চাকাতে লোহার বেড় বসালে ঢাকা মজবুত হয়। লোহার বেড় এর ব্যাস সাধারণ তাপে চাকার ব্যাস অপেক্ষা কম থাকে। যখন লোহার বেড়ে তাপ প্রয়োগ করা হয় তখন লোহার বেড় এর ব্যাস বৃদ্ধি পায় এবং এটি চাকার চতুর্দিকে বসিয়ে দেয়া হয়। বেড়টি ঠান্ডা হলে সংকুচিত হয় এবং চাকার সাথে দৃঢ়ভাবে আটকে যায়।
(গ) বোতলের ছিপি খোলা ঃ বিভিন্ন প্রকার শিশি বোতলের ধাতুর তৈরি ঢাকনা অনেক সহজে খুলতে পারা যায় না অথচ সামান্য তাপ প্রয়োগ করলে সহজেই খুলে যায়। কারণ ধাতুর প্রসারণ গুণাঙ্ক, কাচের প্রসারণ গুণাঙ্ক অপেক্ষা অনেক বেশি। তাই তাপে ধাতুর যে পরিমাণ প্রসারণ ঘটে কিন্তু কাচের সেই পরিমাণ প্রসারণ ঘটে না ।
(ঘ) টেলিফোন, টেলিগ্রাফ ও বিদ্যুতের লাইনের তার ঢিলা থাকে ঃ গ্রীষ্মকাল অপেক্ষা শীতকালে তাপমাত্রার পরিমাণ কম থাকে, তাপমাত্রার হ্রাস ঘটলে তার সংকুচিত হয়। তাই টেলিফোন, টেলিগ্রাম ও বিদ্যুতের লাইনের দুই পোস্টের মধ্যে তার ঢিলা না থাকলে শীতকালে সংকুচিত হওয়ার কারণে তার ছিঁড়ে যেতে পারে বা পোস্ট ভেঙে যেতে পারে। তাই তারগুলো ঢিলা রাখা হয় যাতে সংকুচিত হলে কোনো অসুবিধা না হয়। নিম্নে চিত্র দেওয়া হল-

(ঙ) কাচ ও ধাতব পাতের সংযুক্তকরণের সমস্যা ঃ সাধারণত ইলেকট্রিক বাল্ব-এ কাচের ভেতরে তার প্রবেশ করানো হয়। তার প্রবেশ করানোর পর কাচ নিচ্ছিদ্রভাবে গলিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু যদি কাচের প্রসারণ গুণাঙ্ক ও তারের প্রসারণ গুণাঙ্ক সমান না হয় তবে ঠান্ডা হলে হয় কাচ ভেঙ্গে যাবে, না হয় তার ছিঁড়ে যাবে। তাই কাচের প্রসারণ গুণাঙ্কের সমান গুণাঙ্কবিশিষ্ট তার প্রবেশ করানো হয়। এজন্য প্লাটিনাম বা নিকেল সংকর ধাতুর তার ব্যবহার করা হয়। এদের প্রসারণ গুণাঙ্ক কাচের প্রসারণ গুণাঙ্কের সমান।
(চ) রিভেট দ্বারা ধাতব পাত জোড়া লাগানো ঃ দু’টি পাত জোড়া দিতে হলে পাত দু’টি পর পর রেখে একটি ছিদ্র করা হয়। অতঃপর রিভেট বা খিল গরম করে একে নরম করা হয় এবং ঐ ছিদ্রের মধ্যে ঢুকানো হয়। এই অবস্থায় হাতুড়ির সাহায্যে রিভেটটিকে পিটিয়ে প্লেটের সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। রিভেট যখন ঠান্ডা হয় তখন তা সংকুচিত হয়ে পাত দু’টিকে পরস্পরের সাথে দৃঢ়ভাবে আটকিয়ে রাখে।
নিম্নে চিত্র দেওয়া হল-

(ছ) হারিকেনের চিমনি কাটা ঃ হারিকেনের গরম চিমনিতে পানি পড়লে চিমনি ফেটে যায়। কারণ চিমনি তাপ কুপরিবাহী। কাজেই চিমনির যে অংশে পানি পড়ে সেই অংশ ঠান্ডা হয়ে যায় এবং সংকুচিত হয়। কিন্তু কাচ তাপ কুপরিবাহী বিধায় কাচের অন্য অংশ শীতল হয় না এবং সংকুচিত হয় না। এই কারণে হারিকেনের চিমনি ফেটে যায় । (জ) অগ্নি সংকেত ঃ অগ্নি সংকেতে পিতল ও লোহার যুক্ত দণ্ড থাকে। ঘরে আগুন লাগলে দণ্ড বেঁকে যায় এবং তড়িৎ বর্তনী সম্পূর্ণ হয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে সংকেত ঘণ্টা বেজে উঠে।
(ঝ) লোহার সেতুর একপ্রান্ত দৃঢ়ভাবে আটকানো হয় না ঃ লোহার সেতু বানানোর সময় একপ্রান্ত আটকানো হয় না। কারণ লোহা উত্তপ্ত হলে এর প্রসারণ ঘটবে। ঐ চিন্তা করে তার জন্য জায়গা রাখতে হয়। সেজন্য সেতুর একপ্রান্ত একাধিক চাকার উপর রাখা হয় যাতে লোহা প্রসারিত হয়ে শুধু একদিকে বৃদ্ধি পায় ৷
নিম্নে চিত্র দেওয়া হল-

(ঞ) শীত ও গ্রীষ্মে কাঠের দরজার হ্রাস-বৃদ্ধি ঃ শীতকালে কাঠের দরজা-জানালায় ফাঁক দেখা যায়, আবার গ্রীষ্মকালে ঐ দরজা-জানালা সহজেই আটকাতে চায় না। উপযুক্ত কাঠ দিয়ে দরজা-জানালা তৈরি না করলে তাপমাত্রা পরিবর্তনের সাথে সাথে কাঠের সংকোচন ও প্রসারণ ঘটে।
(ঠ) দালানের উপর ছাদ নির্মাণ ঃ ছাদ নির্মাণে লোহার রড, সিমেন্ট ও কনক্রিট ব্যবহার করা হয়। দিনের ছাদ উত্তপ্ত হয়ে প্রসারিত হয়। আবার রাতের বেলায় ছাদ ঠান্ডা হয় এবং সংকুচিত হয়। ফলে কোনো বিশেষ। অবলম্বন না করলে ছাদের নিচেই দেয়াল ফেটে যায়। এজন্য দেয়াল ও ছাদের সংযোগস্থলে কাগজ, কোনো বস্তু ব্যবহার করা হয়। ফলে দেয়ালের কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে না ।
(ড) পুরু কাচের গ্লাসে গরম পানি ঢাললে ফেটে যায়ঃ পুরু কাচের গ্লাসে গরম পানি ঢাললে তা ফেটে যায়। কার গরম পানি ঢালার সাথে সাথে গ্লাসের ভিতরের অংশ প্রসারিত হয়, কিন্তু গ্লাসের বাইরের অংশ প্রসারিত হয় না। কারণ কা তাপ কুপরিবাহী। ফলে ভিতরের অংশ প্রসারণের কারণে কাচ পাত্রটি ফেটে যায় ।

3 thoughts on “বিভিন্ন বস্তুর প্রসারণজনিত সমস্যাদির প্রতিবিধান | পদার্থের উপর তাপের প্রভাব | পদার্থবিজ্ঞান”