তাপীয় কুপরিবাহী পদার্থ এর ধর্ম আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি এনসিটিবি এসএসসি – পদার্থবিজ্ঞান পদার্থ ও তার গতির বিজ্ঞান। বাংলায় “পদার্থবিজ্ঞান” শব্দটি একটি সমাসবদ্ধ পদ। “পদার্থ” ও “বিজ্ঞান” দুটি সংস্কৃত শব্দ নিয়ে এটি গঠিত। এর ইংরেজি পরিভাষা Physics শব্দটি গ্রিক φύσις (ফুঁসিস) অর্থাৎ “প্রকৃতি”, এবং φυσικῆ (ফুঁসিকে) অর্থাৎ “প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞান” থেকে এসেছে। পদার্থবিজ্ঞান বলতে বলা যেতে পারে এটা হলো গণিতের বাস্তব রূপ।
তাপীয় কুপরিবাহী পদার্থ এর ধর্ম
আমরা জানি, তাপ সর্বদা উচ্চ তাপমাত্রা বিশিষ্ট স্থান হতে নিম্ন তাপমাত্রা বিশিষ্ট স্থানে সঞ্চালিত হয়। তাই হিমাগার বা রেফ্রিজারেটর প্রভৃতিতে বাহির থেকে তাপ এদের ছাদ, দেওয়াল এবং নিম্নাঙ্ক হতে ভিতরে আসে। এয়ারকন্ডিশন স্থান বা রেফ্রিজারেটরে প্রবাহিত তাপের পরিমাণ কমানোর জন্য ভাল কুপরিবাহী পদার্থ (Insulating materials) এদের দেওয়াল, ছাদ বা মেঝেতে ব্যবহার করা হয়। তাপ পরিবহন, পরিচালন ও বিকিরণের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয়।
এয়ারকন্ডিশন স্থানে বা রেফ্রিজারেটরের দেওয়াল ও ছাদ দিয়ে যে তাপ সঞ্চালিত হয়ে ভিতরে আসে তা কমানোর জন্য অবশ্যই পরিবহন ও পরিচলন প্রক্রিয়ায় তাপ সঞ্চালন কমাতে হয়। যেসব পদার্থের তাপ পরিবহন গুণাঙ্ক কম সেসব পদার্থ ব্যবহার করে পরিবহন প্রক্রিয়ায় সঞ্চালিত তাপের পরিমাণ কমানো যায়। পরিচলন প্রক্রিয়ায় সঞ্চালিত তাপের পরিমাণ কমানো যায় সেই সব কুপরিবাহী পদার্থ ব্যবহার করে যাদের মধ্যে ছোট ছোট বদ্ধ বাতাসের কোষ (Cell) থাকে ।
অর্থাৎ যেসব কুপরিবাহী পদার্থের তাপ পরিবহন গুণাঙ্ক কম এবং যাদের ছোট ছোট বদ্ধ বাতাসের কোষ থাকে,সেগুলো ভাল কুপরিবাহী হিসাবে হিমাগারে বা রেফ্রিজারেটরে ব্যবহৃত হয়।
বাষ্প চাপের জন্য বাতাসের মধ্যকার জলীয় বাষ্প গরম অঞ্চল থেকে শীতল অঞ্চলে যায়। দরজা খোলার সময় বা কোনো . ভাঙা অংশ দিয়ে জলীয় বাষ্প হিমাগার বা রেফ্রিজারেটরের ভিতরে প্রবেশ করে। এই জলীয় বাষ্প ভিতরে গিয়ে ইভাপোরেটরের উপর জমে তার কর্মদক্ষতাকে কমিয়ে দেয়। এজন্য হিমাগার বা ফ্রিজের দেওয়াল, ছাদ ও মেঝেতে কুপরিবাহী পদার্থ দিয়ে ঢাকা ছাড়াও এদের গরম পার্শ্বে বাষ্প রোধক ব্যবহার করা হয়। অ্যালুমিনিয়ামের পাত, পলিথিন সীট, বিটুমিন ইত্যাদি বাষ্প রোধক হিসাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সাধারণত এগুলো ক্ষুদ্র ছিদ্র বা সংযোগ স্থানে ব্যবহার করা হয় ।
কুপরিবাহী নির্বাচনঃ কুপরিবাহী নির্বাচনের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয় । যথা- (১) নিম্ন তাপ পরিবহন গুণাঙ্ক, (২) বাষ্প ভেদ্যতা, (৩) আগুন রোধক, (৪) যান্ত্রিক শক্তি এবং দৃঢ়তা, (৫) ক্ষুদ্র পোকামাকড় এবং ছত্রাক রোধ, (৬) ন্যূনতম আর্দ্রতা শোষক, (৭) ব্যবহারের সুবিধা, (৮) মূল্য ।
কোন কাজে কী ধরনের পুরুত্বের কুপরিবাহী পদার্থ ব্যবহৃত হবে তা নির্ভর করে এর তাপ পরিবাহঙ্ক, ঘনত্ব এবং
কাজের প্রকৃতির উপর ভাল কুপরিবাহীর ধর্ম (Properties of a good thermal insulation) :
১। মজবুত হতে হবে,
৩। আগুনে জ্বলবে না,
৫। তাপ প্রবাহ রোধ করার ক্ষমতা,
২। ওজনে হালকা হবে,
৪ । আগুনে জ্বলতে সহায়তা করবে না,
৬। পানি শোষণ করবে না,
৭। গন্ধ তৈরি করবে না,
৮। তাপমাত্রার পরিবর্তনে বৈশিষ্ট্যের কোনো পরিবর্তন ঘটবে না,
৯। দীর্ঘস্থায়িত্ব হতে হবে,
১০। দামে সস্তা হতে হবে,
১১। বাজারজাত করার সহজ উপায় থাকতে হবে ইত্যাদি ।
(ক) তাপীয় কুপরিবাহী ধর্মের ব্যবহারিক প্রয়োগের তালিকা (যেমন— ফ্রিজ, থার্মোফ্লাস্ক এবং বিচ্ছি কুপরিবাহী) :
১। রেফ্রিজারেটর বা হিমায়ন যন্ত্র (Refrigerator) :
রেফ্রিজারেটর বা হিমায়ন যন্ত্রে বাষ্পায়ন পদ্ধতি কাজে লাগানো হয় অর্থাৎ পরিবহন, পরিচলন ও বিকিরণ পদ্ধতি পরিবর্তন করে বাষ্পায়ন পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করা হয়। বাস্পায়নের ফলে রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা অনেক কম থাকে। রেফ্রিজারেটরে বিভিন্ন অংশ থাকে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশসমূহ নিম্নে বর্ণনা করা হল :
(ক) সংনমক (Compressor) :
সংনমক একটি পাম্প, এর সাহায্যে হিমাঙ্কের নিম্নচাপের বাষ্পকে আগমন নল দ্বারা প্রবেশ করে অধিক চাপে নির্গমন নল দ্বারা কন্ডেন্সারের দিকে বায়ু চালনা করা হয়।

(খ) কনডেন্সার (Condenser) ঃ
এটি তামার প্যাচানো নলবিশেষ। এর মধ্যে শীতল পানি প্রবাহিত হয়। এটি রেফ্রিজারেটরের মধ্যে রাখা হয়। কমপ্রেসর থেকে বাষ্প প্রবাহ কনডেন্সারের তামার প্যাচানো নল অতিক্রম করার সময় সংনমনে উৎপন্ন তাপ ও এর সুপ্ত তাপ বর্জিত হওয়ার ফলে কনডেন্সারের হিমাঙ্কের বাষ্পকে ঘনীভূত করে তরলে পরিণত করে থাকে ।
(গ) গ্রাহক (Receiver) ঃ
কনডেন্সারে যে পানি সৃষ্টি হয় তা এই অংশে জমায়িত থাকে ।
(ঘ) প্রসারণ ভালভ (Expansion valve) :
প্রসারণ ভাভের সাহায্যে গ্রাহক হতে আগত তরলের চাপ কমানো হয় এবং হিমাঙ্কের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে বাষ্পায়নের হার স্থির রাখা হয়।
(ঙ) বাষ্পকারক (Evaporator) :
যন্ত্রের এই অংশেও তামার একটি প্যাচানো নল থাকে। রেফ্রিজারেটর শীতল করার জন্য এই অংশ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। শীতল করার জন্য নির্দিষ্ট প্রকোষ্ঠটিতে প্রয়োজনীয় তাপ সরবরাহ করা হয়। প্রকোষ্ঠে প্যাচানো নলটির তাপমাত্রা অনেক কম থাকাতে পার্শ্ববর্তী পারিপার্শ্বিক হতে তাপ শোষণ করে, প্রকোষ্ঠটির তাপমাত্রা পানির কঠিনীভবনের তাপমাত্রায় এবং পানি পার্শ্বিকের তাপমাত্রাও বহু নিচে নেমে আসে।
২। থার্মোফ্লাস্ক (Thermoflask) :
বিজ্ঞানী ডিওয়ার তরল গ্যাস রাখার জন্য এই ফ্লাস্ক আবিষ্কার করেন। একে আবার ডিওয়ার ফ্লাস্কও বলা হয়। বর্তমানে এই ফ্লাস্ক নিত্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
গঠনপ্রণালি ঃ
থার্মোফ্লাস্ক এমনভাবে নির্মাণ করা হয় যাতে পরিবহন, পরিচলন ও বিকিরণ এই তিন পদ্ধতির কোনো পদ্ধতিতে তাপ ভিতরে প্রবেশ বা ভিতর হতে বের হতে না পারে ।
এতে একটি দ্বি-দেয়াল বিশিষ্ট কাচের পাত্র A (চিত্র ঃ ৪.৭) থাকে এবং পাত্রের সরু মুখ কুপরিবাহী কর্ক C দ্বারা বন্ধ থাকে। এই পাত্রের দু’ দেয়ালের মধ্যবর্তী স্থানে যতদূর সম্ভব বায়ুশূন্য করা হয়। এর ভিতরের দেয়ালের বাইরের তল এবং বাইরের দেয়ালের ভিতরের তলে রুপার প্রলেপ দেওয়া হয়। কাচপাত্রটি একটি স্প্রিং-এর উপর বসানো থাকে এবং পাত্রটি একটি ধাতব পাত্র M দ্বারা ঘেরা থাকে। কাচপাত্র ও ধাতব পাত্রের মাঝখানে পরিবাহী পদার্থ রাখা হয়।
কার্যপ্রণালি :
কোনো তরল পদার্থ থার্মোফ্লাস্কে রাখলে এর ভিতর হতে তাপ বাইরে আবার বাহির হতে তাপ ভিতরে খুবই কম পরিবাহিত হয়। কারণ কাচ কুপরিবাহী পদার্থ ।

আবার কাচের দু’ দেয়ালের মাঝে বায়ুশূন্য হওয়ায় পরিবহন ও পরিচলন প্রক্রিয়ায় কোনো তাপ চলাচল করতে পারে না। আবার পাত্রের বাইরের দেয়ালের ভিতরের তল এবং ভিতরের দেয়ালের বাইরের তল রুপার প্রলেপ দ্বারা মসৃণ হওয়ায় বাইরে বা ভিতর হতে কোনো তাপ বিকীর্ণ প্রক্রিয়ায় চলাচল করতে পারে না। অর্থাৎ প্রতিফলনের কারণে ভিতরের তাপ ফ্লাস্কের ভিতরে থাকে এবং বাইরের তাপ বাইরে থাকে। আবার ফ্লাস্কের মুখে কুপরিবাহী কর্ক থাকে যার কারণে কোনো তাপ বের হতে পারে না। এ ছাড়া ধাতব পাত্র ও কাচবাহী পাত্রের মধ্যে কুপরিবাহী পদার্থ থাকায় কোনো তাপ চলাচল করতে পারে না।
৩। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (Air-conditioning) :
যে প্রক্রিয়ায় কোনো আবদ্ধ স্থানের বায়ুর তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে গ্রীষ্মের সময় শীতল ও শীতের সময় গরম রেখে মানবদেহের উপযোগী করা হয়, সেই কৃত্রিম প্রক্রিয়াকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বলা হয়। সাধারণত বড় ঘর, হলরুম, অডিটোরিয়াম, সিনেমা হল, বড় বড় অফিস ইত্যাদিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের মৌলিক বিষয় ঃ
কোনো আবদ্ধ স্থানে পুরোপুরি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
যথা ঃ
১। তাপমাত্রা 75°F হতে 77°F
৩। বায়ুর বেগ 25 ফুট / সেকেন্ড হতে 75 ফুট / সেকেন্ড ও এ ছাড়া বায়ুকে গন্ধহীন, বিশুদ্ধ ও ধুলাবালিমুক্ত করতে হয়।
২। আপেক্ষিক আর্দ্রতা 60% হতে 65%
৪। মুক্ত বায়ু প্রবাহ ন্যূনতম 25% ।
কোনো ঘর বা হলরুম শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমে বায়ু পাম্পের সাহায্যে উপযুক্ত ফিল্টারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করে ধূলিকণা, ধোঁয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড, বিষাক্ত গ্যাস ইত্যাদি মুক্ত করা হয়। পরে পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ বায়ুর সাথে প্রয়োজনীয় পানি মিশ্রিত করে হলরুমে চালনা করা হয়। এ ছাড়া গরমের সময় বায়ুকে রেফ্রিজারেটরের সাহায্যে শীতল করা হয়। আবার শীতকালে তড়িৎ প্রবাহ দ্বারা তার কুণ্ডলী উত্তপ্ত করে বায়ু গরম করা হয়।
৪। সবুজ ঘর (Greenhouse) :
শীতপ্রধান দেশে তীব্র শীতের কারণে কোনো কোনো উদ্ভিদ বাচতে পারে না । তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই ঘর তৈরি করা হয়। এটি একটি কাচের ঘর। সবুজ উদ্ভিদের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় এজন্য এদেরকে কাচের ঘরের ভিতর রাখা হয় বলে একে সবুজ ঘর বলা হয়।
সূর্য বা চুল্লীর বিকীর্ণ তাপ অতি সহজেই কাচ ভেদ করে যেতে পারে। ফলে ঐ তাপ সবুজ ঘরের ভিতরের উদ্ভিদ ও মাটি উত্তপ্ত রাখে কিন্তু ঘরের ভিতরের তাপমাত্রা 100°C অপেক্ষা কম বিধায় কোনো তাপ বিকিরণ করে বের হতে পারে না। কারণ বিকীর্ণ তাপের তাপমাত্রা 100°C এর কম হলে কাচ বিকিরণ অস্বচ্ছ পদার্থের ন্যায় ক্রিয়া করে। এই জন্য ঘরের ভিতরের তাপ ঘরের মধ্যে আবদ্ধ থাকে।
৫। মরু অঞ্চলে দিনে তীব্র গরম এবং রাত্রিতে খুব ঠান্ডা পড়ে ৪ মরুভূমির :
বায়ু শুষ্ক হওয়ায় ঐ বায়ু স্বচ্ছ পদার্থের ন্যায় কাজ করে। ফলে ঐ বায়ু ভেদ করে তাপ ভূপৃষ্ঠে এসে পড়ে। ফলে ভূপৃষ্ঠ খুবই উত্তপ্ত হয়। রাত্রিতে ভূপৃষ্ঠ তাপ বিকিরণ করে । শুষ্ক বায়ুর মধ্য দিয়ে তাপ সহজেই বায়ুমণ্ডলে চলে যেতে পারে। ফলে ভূপৃষ্ঠ অত্যধিক শীতল হয়। এজন্য মরু অঞ্চলে দিনে তীব্র গরম এবং রাত্রিতে ভীষণ শীত পড়ে।
৬। ধাতব পাতিলে তাড়াতাড়ি রান্না হয় ঃ
ধাতব পদার্থ তাপ সু-পরিবাহী, বিশেষ করে রুপা, তামা, অ্যালুমিনিয়াম মরু অঞ্চলে দিনে তীব্র গরম এবং রাত্রিতে ভীষণ শীত পড়ে। তাপ ধাতব পদার্থ তাপ সু-পরিবাহী, বিশেষ করে রুপা, তামা, অ্যালুমিনিয়াম তাপ সুপরিবাহী। এজন্য তামা ও অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে রান্নার পাতিল তৈরি করা হয়। তামা বা অ্যালুমিনিয়াম পাত্রে তাপ খুব পদার্থ, দিলে তাপ দ্রুত বেগে সর্বদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং খাদ্যদ্রব্যে সঞ্চালিত হয়। ফলে তাড়াতাড়ি রান্না হয়।
৭। কাচের গ্লাসে হঠাৎ গরম পানি ঢাললে ফেটে যায় কিন্তু ধাতব গ্লাসে থাকলে তা ফাটে না ঃ
কাচ কুপরিবাহী কাচের গ্লাসে হঠাৎ করে গরম পানি ঢাললে পানির অধিকৃত অংশটুকু গ্লাসের ভিতরের অংশ গরম করে কিন্তু যেখানে পানি নেই অর্থাৎ গ্লাসের বাইরের অংশ সাথে সাথে উত্তপ্ত হয় না। তাই শীতল অংশ প্রসারণে বাধা দেয়। ফলে যে বলের সৃষ্টি হয় তাতে গ্লাস ফেটে যায়। কিন্তু গ্লাসের মধ্যে যদি ধাতব চামচ থাকে সেই ধাতব চামচ গরম পানি ঢালার সাথে সাথে সেই তাপ গ্রহণ করে। যতক্ষণ পর্যন্ত গরম পানির তাপমাত্রা ও ধাতব চামচের তাপমাত্রা সমান না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত বিক্রিয়া চলতে থাকে। চামচ তাপ গ্রহণ করে কিছুটা ঠান্ডা করে দেয় বলে কাচের গ্লাস ফাটে না।
৮। চায়ের কেটলির হাতল কুপরিবাহী পদার্থের হলে সুবিধা হয় ঃ
কুপরিবাহীর মধ্য দিয়ে সহজেই তাপ সঞ্চালন হতে পারে না। তাই, কেটলির হাতল কুপরিবাহী পদার্থ দ্বারা মোড়ানো থাকলে সহজেই নাড়াচাড়া করা যায় এবং হাতে কোনো তাপ লাগে না। ফলে কাজের সুবিধা হয়।
৯ । পাতলা কাগজে পানি ফোটানো যায় কিন্তু মোটা কাগজে যায় না ঃ
কোনো বস্তু যদি কুপরিবাহী হয় তবে তাকে খুবই পাতলা করা হলে সেটা সুপরিবাহী পদার্থের ন্যায় কাজ করে। কাজেই কাগজ যতই কুপরিবাহী হোক না কেন, যখন খুবই পাতলা করে তৈরি করা হয় তখন তা সুপরিবাহীর ন্যায় কাজ করে। আবার কাগজের জ্বলনাঙ্ক 100° সেলসিয়াসের অনেক উপরে। তাই একটা পাতলা কাগজের ঠোঙা তৈরি করে তাতে আংশিক পানি পূর্ণ করে তাপ প্রয়োগ করলে পানি ফুটতে থাকবে। সমস্ত পানি ফুটে বাষ্পে পরিণত হলে তাপমাত্রা 100° সেলসিয়াসের বেশি হবে। তখন কাগজ পুড়ে যাবে। কিন্তু মোটা কাগজে পানি ফুটাতে গেলে কাগজ মোটার কারণে কাগজের তলদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। ফলে পানি না ফুটে কাগজ পুড়ে যাবে ।
১০। শীতকালে পুরাতন লেপের চেয়ে নতুন লেপ বেশি আরামদায়ক ঃ
বায়ু কুপরিবাহী, তাই নতুন লেপের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ বায়ু আবদ্ধ থাকে। লেপ গায়ে দিলে লেপের বায়ু দেহের তাপ বাইরে যেতে দেয় না। তাই শরীরের তাপমাত্রা শরীরকে গরম রাখে । পুরাতন লেপের তুলা পিষ্ট হয়ে যায়, ফলে বেশি বায়ু ধারণ করতে পারে না। বায়ুর পরিমাণ কম থাকার কারণে সে লেপ নতুন লেপের সমান কার্যক্ষম হতে পারে না। ফলে নতুন লেপ পুরাতন লেপ অপেক্ষা বেশি আরামদায়ক ।
১১। কাঠের গুঁড়ার মধ্যে বরফ ভাল থাকে ঃ
কাঠের গুঁড়া তাপ কুপরিবাহী। এ ছাড়া বরফকে যখন কাঠের গুঁড়া দ্বারা ঢেকে দেয়া হয় তখন কাঠের গুঁড়ার মধ্যে একটি পুরু বায়ুর স্তর আবদ্ধ থাকে যা অত্যন্ত তাপ কুপরিবাহী । তাই বাইরের তাপ শুধুমাত্র কাঠের গুঁড়া ও বায়ুস্তরে এসে পড়ে। বরফের গায়ে পড়ে না, ফলে বরফ গলে না ।
১২। খড়ের ঘর গরমকালে টিন বা কনক্রিট ঘরের চেয়ে শীতল এবং শীতকালে গরম থাকে ঃ
খড় তাপ কুপরিবাহী। খড়ের মধ্যে প্রচুর বাতাস আবদ্ধ থাকে এবং পুরু বায়ুস্তর সৃষ্টি করে। গ্রীষ্মকালে খড়ের ঘরে তাপ পড়লে তাপ বায়ুস্তর ও খড় ভেদ করে ঘরের মধ্যে খুব বেশি প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু টিন বা কনক্রিট তাপ সুপরিবাহী, তাই গ্রীষ্মকালে টিন বা কনক্রিট এর উপর তাপ পড়লে তা সহজেই ভেদ করে ঘরের মধ্যে যেতে পারে এবং ঘরকে গরম রাখে। শীতকালে একই কারণে তাপ খড়ের ঘর থেকে বের হতে পারে না। কিন্তু টিন বা কনক্রিট এর ঘর হতে সহজেই তাপ বের হয়ে আসতে পারে। তাই খড়ের ঘর গরমকালে ঠান্ডা ও শীতকালে গরম থাকে।
১৩। রৌদ্রে রাখা এক টুকরা কাঠের চেয়ে এক টুকরা লোহাকে বেশি গরম বোধ হয় ঃ
একখণ্ড লোহা ও কাঠ রৌদ্রে রেখে দিলে উভয়ই সমান তাপ পেয়ে থাকে। তথাপিও লোহা কাঠ অপেক্ষা বেশি গরম হয়ে থাকে। লোহা তাপ সুপরিবাহী কিন্তু কাঠ তাপ কুপরিবাহী। লোহাতে হাত দ্বারা স্পর্শ করা মাত্রই লোহার তাপ হাতে চলে আসে, কিন্তু কাঠে স্পর্শ করার পর খুবই কম তাপ হাতে এসে পৌঁছায়। এজন্য লোহা স্পর্শ করা মাত্র অধিক দ্রুত আমাদের হাতে গরমের অনুভূতির সৃষ্টি করে।
১৪। শীতকালে সুতি কাপড়ের চেয়ে পশমী কাপড়ে শীত কম লাগে ঃ
পশমী কাপড়ের সুতার আঁশগুলো, সুতি কাপড়ের সুতার আঁশগুলো অপেক্ষা অনেক পাতলা থাকে। এতে পশমী কাপড়ে অনেক ছিদ্র থাকে এবং ছিদ্রগুলোতে বাতাস আটকে থাকে। বায়ু তাপ কুপরিবাহী এবং পশমী কাপড় নিজেও তাপ কুপরিবাহী। কাপড়ের সুতার আঁশগুলো অপেক্ষা অনেক পাতলা থাকে। এতে পশমী কাপড়ে অনেক ছিদ্র থাকে এবং ছিদ্রগুলোতে বাতাস আটকে থাকে। বায়ু তাপ কুপরিবাহী এবং পশমী কাপড় নিজেও তাপ কুপরিবাহী। এই জন্য পশমী কাপড় পরলে দেহের তাপ খুব একটা পরিবাহিত হতে পারে না। ফলে বেশ গরম লাগে। কিন্তু সুতি কাপড়ে কোনো ছিদ্র থাকে না। তাই সুতি কাপড় পরলে সহজেই তাপ বের হতে পারে, ফলে ঠান্ডা লাগে।
১৫। অগ্নি শিখা ও তার জালি ঃ
একটি জ্বলন্ত বার্নারের শিখার উপর একটি তামার তার জালি ধরলে দেখা যায় শিখা জালি ভেদ করে উপরে উঠতে পারছে না। এর কারণ তামার জালি তাপ সুপরিবাহী। শিখা জালির সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে তাপ চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়। ফলে জালির উপর গ্যাস উত্তপ্ত হতে পারে না এবং জ্বলনাঙ্কে পৌঁছাতে পারে না। এখন বার্নার নিভিয়ে জালিকে একটু উপরে ধরে জালির উপরে আগুন জ্বালালে দেখা যাবে উপরের অংশে আগুন জ্বলছে কিন্তু শিখা নিচে পৌছাতে পারছে না। এর কারণ হল, তামার জালি চারদিকে তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে । ফলে তলার গ্যাস তাপের অভাবে জ্বলনাঙ্কে পৌছাতে পারছে না ।

2 thoughts on “তাপীয় কুপরিবাহী পদার্থ এর ধর্ম | তাপ সঞ্চালন | পদার্থবিজ্ঞান”