আজকে আমরা গ্যালভানোমিটার : চল কুন্ডলী গ্যালভানোমিটার সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা বাউবি এইচএসসি ২৮৭১ পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্র ইউনিট ৩ তড়িৎ প্রবাহের চৌম্বক ক্রিয়া এর অন্তর্ভুক্ত।

গ্যালভানোমিটার : চল কুন্ডলী গ্যালভানোমিটার
গ্যালভানোমিটার ( Galvanometer)
যে যন্ত্রের সাহায্যে কোন বর্তনীর তড়িৎপ্রবাহের অস্ত্বিত্ব ও পরিমাণ নির্ণয় করা হয়, তাকে গ্যালভানোমিটার বলে। ইতালিয় বিজ্ঞানী গ্যালভানীর নামানুসারে এ যন্ত্রের এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। চুম্বকের উপর তড়িৎ প্রবাহের ক্রিয়া অথবা তড়িৎ প্রবাহের উপর চুম্বকের ক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে এর কার্যনীতি প্রতিষ্ঠিত ।
সকল গ্যালভানোমিটারকে সাধারণত দু’শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। যথা:
(১) চল চুম্বক গ্যালভানোমিটার :
যে গ্যালভানোমিটারে কুন্ডলী স্থির থাকে, কিন্তু চুম্বক শলাকা মুক্ত অবস্থায় থাকে, তাকে চল চুম্বক গ্যালভানোমিটার বলে। অ্যাস্টাটিক গ্যালভানোমিটার, ট্যানজেন্ট গ্যালভানোমিটার, সাইন গ্যালভানোমিটার ইত্যাদি চলচুম্বকে গ্যালভানোমিটার।
(২) চল কুন্ডলী গ্যালভানোমিটার :
যে গ্যালভানোমিটার কুন্ডলী মুক্ত অবস্থায় থাকে, কিন্তু চুম্বক স্থির থাকে তাকে চল কুন্ডলী গ্যালভানোমিটার বলে। ডি আরসোঁভ্যাল গ্যালভানোমিটার একটি চল কুন্ডলী জাতীয় গ্যালভানোমিটার ।
নিচে বহুল ব্যবহৃত একটি চল কুন্ডলী গ্যালভানোমিটারের বর্ণনা দেয়া হলো ।
চলকুন্ডলী গ্যালভানোমিটার (Moving coil galvanometer) :
ফরাসি বিজ্ঞানী ডি আরসোঁভাল (D. Arsonval) এ যন্ত্রটি আবিষ্কার করেন বলে একে ডি আরসোঁভ্যাল গ্যালভানোমিটারও বলা হয়। এ যন্ত্রের সাহায্যে অতি অল্প পরিমাণের প্রবাহমাত্রাও (10″ A হতে 10A পর্যন্ত্) মাপা যায় ।
গঠন:
এ গ্যালভানোমিটারে একটি চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে কোন অক্ষ সাপেক্ষে ঘূর্ণনক্ষম অবস্থায় একটি তারের কুন্ডলী ঝুলানো থাকে। এ কুন্ডলীতে যখন তড়িৎ প্রবাহ চলে তখন চৌম্বকক্ষেত্র কর্তৃক প্রযুক্ত বলের প্রভাবে এতে একটি দ্বন্দ্ব ক্রিয়া করে। ফলে কুন্ডলীটি ঘুরে এবং এ ঘূর্ণনের পরিমাণ হতে প্রবাহমাত্রা নির্ণয় করা যায়।

গঠন:
এ যন্ত্রে একটি হালকা ধাতব আয়তাকার ফ্রেমের উপর অন্য়রিত তামার তার জড়িয়ে অনেকগুলো পাক বিশিষ্ট একটি কুন্ডলী EFGH তৈরি করা হয় (চিত্র: ৩.২১)। কুন্ডলীটি একটি ব্যবর্ত প্রার্ল্ড (Torsion head) T হতে ফসফর ব্রোঞ্জ (Phosphor Bronze) এর একটি সর— তার P দ্বারা U আকৃতির একটি শক্তিশালী অশ্বখুরাকৃতি চুম্বকের N-S মের—দ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে ঝুলানো থাকে। কুলীটির নিচের প্রাক্ড ফসফর ব্রোঞ্জ-এর আর একটি স্প্রিং D-এর সাথে যুক্ত। T ও D এর নিম্নপ্রান্ত্ যন্ত্রের পাটাতনের উপর দুটি সংযোজক স্ক্রুর (S1,S2) সাথে আটকানো থাকে। এ স্ক্রু দুটি দিয়ে যন্ত্রের মধ্যে তড়িৎ প্রবাহ পাঠানো হয়।
নরম লোহার চোঙাকৃতি একটি টুকরা (J) কুন্ডলীর মাঝখানে কাঠের বোর্ডে আবদ্ধ থাকে। কুন্ডলী ঐ লোহার টুকরাকে স্পর্শ না করে টুকরা এবং চুম্বক মের—দ্বয়ের ফাঁকের মধ্য দিয়ে অবাধে ঘুরতে পারে। চুম্বক মের—দ্বয়ের অক্ষ এবং চোঙাকৃতি টুকরার অক্ষ একই হতে হবে। লোহার টুকরা রাখার ফলে চৌম্বকক্ষেত্র খুব তীব্র হয়।
N—S মের—দ্বয় অবতল আকৃতির। এর ফলে, কুন্ডলীর যে কোনো অবস্থানে কুন্ডলীতল চৌম্বক ক্ষেত্র রেখার সমাালে থাকে। ঝুলানো তার P-এর সাথে একটি ক্ষুদ্র দর্পণ M লাগানো থাকে। কোন উৎস হতে আলোকে রশ্মি দর্পণে ফেলা হয়। দর্পণ হতে প্রতিফলিত রশ্মি একটি স্কেলের উপর ফেলে কুলীর বিক্ষেপ পরিমাপ করা হয়।

কার্যনীতি:
ধরা যাক, কুন্ডলীতে I A তড়িৎ প্রবাহিত হচ্ছে। EF ও GH বাহু চৌম্বক ক্ষেত্রের সমাাল হওয়ায় বাহু দ্বয়ের উপর ক্রিয়াশীল বলের মান শূন্য [চিত্র]।
EH ও FG বাহু দুটিতে প্রবাহের অভিমুখ বিপরীতমুখী হওয়ায় বাহুদুটির উপর ক্রিয়াশীল বলের দিকও বিপরীতমুখী। সুতরাং কুন্ডলীর দু’বাহুর উপর দুটি সমান, সমাাল ও বিপরীতমুখী বল ক্রিয়া করায় একটি দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় এবং এ দ্বন্দ্ব কুন্ডলীকে সাম্যাবস্থা থেকে বিক্ষিপ্ত করতে চেষ্টা করে। এ দ্বন্দ্বকে বিক্ষেপক দ্বন্দ্ব (deflecting couple) বলে।
EH ও FG এর প্রত্যেক বাহুর উপর ক্রিয়াশীল বল,
F = nIBI
এখানে, I = কুন্ডলীর দৈর্ঘ্য, n = পাক সংখ্যা, B = চৌম্বক ক্ষেত্র।
অতএব, বিক্ষেপক দ্বন্দ্বের মান,
C1 = F x b = nIBl x b
[ এখানে, b = কুন্ডলীর প্রস্থ]
= nIBA
[:: কুন্ডলীর ক্ষেত্রফল, A = 1 x b]
এ দ্বন্দ্বের ক্রিয়ার ফলে ঝুলানো তারে পাক পড়ে। ঝুলানো তারের স্থিতিস্থাপকতার ধর্ম ঐ পাক খোলার চেষ্টা করে বলে একটি বিপরীত দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এ দ্বন্দ্বকে নিয়ন্ত্রক দ্বন্দ্ব (controlling couple) বলে। এ দ্বন্দ্ব ঘূর্ণনের বির“দ্ধে ক্রিয়া করে। কুন্ডলীটি ৪ কোণে ঘুরে স্থির হলে, নিয়ন্ত্রক দ্বন্দ্বের ভ্রামক,
C2 = τ8
এখানে τ হলো ঝুলনতারের একক মোচড় বা কৌণিক বিক্ষেপের জন্য নিয়ন্ত্রক দ্বন্দ্বের ভ্রামক। একে পাক ধ্রুবক বা ব্যবর্তন ধ্রুবকও বলে ।
কুন্ডলীর সাম্যাবস্থায়,
বিক্ষেপক দ্বন্দ্বের মান = নিয়ন্ত্রক দ্বন্দ্বের মান
বা, C1 = C2
বা, nIBA = τ8
বা, I= (τ/ nBA)8
ধরি, (τ/ nBA) = k = ধ্রুবক (একটি নির্দিষ্ট গ্যালভানোমিটারের জন্য)
I = k8 …………………..(1)
বা, I ∝ 8
অর্থাৎ, বিদ্যুৎ প্রবাহমাত্রা বিক্ষেপ কোণের সমানুপাতিক। k-কে গ্যালভানোমিটার ধ্রুবক বলা হয় ।

গ্যালভানোমিটার ধ্রুবক
যখন 8 =1 একক তখন I = k হয় ।
অর্থাৎ, চলকুন্ডলী গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে কুলীর বিক্ষেপ এক একক হয় তাকে গ্যালভানোমিটার ধ্রুবক বলে ।
একটি চল কুন্ডলী গ্যালভানোমিটারের ধ্রুবক 2×10 Arad-1 -এ কথার তাৎপর্য এই যে, উক্ত গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে 2×10^A তড়িৎপ্রবাহ প্রবাহিত হলে এর বিক্ষেপ 1 rad হবে।
[বিঃ দ্রঃ (১) I পরিমাপের জন্য, বাড়বে, কোণ পরিমাণ করা হয় না। স্কেলের উপর প্রতিফলিত আলোর সরণ (d) পরিমাপ করা হয়। সেক্ষেত্রে, I ∝ d
(২) গ্যালভানোমিটার দ্বারা সাধারণতঃ তড়িৎ প্রবাহের উপস্থিতি নির্ণয় করা হয় এবং দুটি প্রবাহের তুলনা করা হয়; প্রবাহের সঠিক মান নির্ণয় করা হয় না। সঠিক মান নির্ণয়ের জন্য অ্যামমিটার ব্যবহার করা হয়।
চল কুন্ডলী গ্যালভানোমিটারের সুবিধা
(১) এই গ্যালভানোমিটারে কুন্ডলী একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রে স্থাপিত থাকে। ফলে, বাইরের কোন চুম্বকের প্রভাব এর উপর পড়ে না।
(২) প্রবাহমাত্রা (I) বিক্ষেপ কোণের (8) সমানুপাতিক হবার কারণে I পরিমাপে সুষম দাগাঙ্কিত স্কেল ব্যবহার করা যায়।
(৩) যন্ত্রটি ‘ডেড বীট’ (dead beat) প্রকৃতির। তড়িৎ প্রবাহিত হলে কুন্ডলী বিক্ষিপ্ত হয়; আবার, প্রবাহ বন্ধ করলে কুলী বিশেষ কোন দোল না খেয়ে সাম্যাবস্থায় ফিরে আসে।

সার-সংক্ষেপ :
গ্যালভানোমিটার:
যে যন্ত্রের সাহায্যে কোনো বর্তনীর তড়িৎ, প্রবাহের অস্ত্বিত্ব ও পরিমাণ নির্ণয় করা হয়, তাকে গ্যালভানোমিটার বলে।
চল কুন্ডলী গ্যালভানোমিটার :
যে গ্যালভানোমিটারে কুন্ডলী মুক্ত অবস্থায় থাকে, কিন্তু চুম্বক স্থির থাকে- তাকে চল কুন্ডলী গ্যালভানোমিটার বলে ।
গ্যালভানোমিটার ধ্রুবক :
চল কুন্ডলী গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে কুন্ডলীর বিক্ষেপ এক একক হয় তাকে গ্যালভানোমিটার ধ্রুবক বলে।
বহু নির্বাচনি প্রশ্ন
১। চল কুন্ডলী গ্যালভানোমিটারে
(i) প্রবাহমাত্রা (I) বিক্ষেপ কোণের (৪) সমানুপাতিক
(ii) যন্ত্রটি ডেড বাঁট প্রকৃতির
(iii) চুম্বক শলাকা মুক্ত অবস্থায় থাকে ।
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. iii
