আজকের আলোচনার বিষয়ঃ চুম্বক ও চুম্বকত্ব। যা বাউবি এইচএসসি ২৮৭১ পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্র ইউনিট ৫ চুম্বকত্ব এর অন্তর্ভুক্ত।

চুম্বক ও চুম্বকত্ব
চুম্বকত্বের কতিপয় মৌলিক বিষয় (Some Fundamental of aspects Magnetism)
চুম্বক:
চুম্বক হচ্ছে সেই সকল পদার্থ যাদের আকর্ষণ ও দিকদর্শী ধর্ম আছে। এ সকল পদার্থ দিয়ে উপযুক্ত পদার্থকে চুম্বক ধর্ম প্রদান করা যায়।
চুম্বকত্ব (Magnetism):
চুম্বক পদার্থের ধর্মই হলো চুম্বকত্ব। চুম্বকত্ব পদার্থের ভৌত ধর্ম। কারণ পদার্থকে চুম্বকে পরিণত করলে এর ভর, A ঘনত্ব, আয়তন ও তাপমাত্রার কোনো পরিবর্তন হয় না। তবে চুম্বকত্বের উপর তাপমাত্রার বাহ্যিক প্রভাব রয়েছে।

চৌম্বক মের— (Magnetic pole):
যেকোনো চুম্বকের যে দুই প্রান্ড্রের আকর্ষণ বল সবচেয়ে বেশি সে প্রাড়কে চৌম্বক মের- বলে।
চিত্রে একটি দন্ডচুম্বকের দুটি মের N ও S দেখানো হয়েছে।
N = North Pole (উত্তরমের )
S = South Pole (দক্ষিণমের )
চৌম্বক অক্ষ (Magnetic axis):
যেকোনো চুম্বকের মের— দুটিকে সংযোগ করে যে সরলরেখা পাওয়া যায়, তাকে চৌম্বক অক্ষ বলে। ৫.১ নং চিত্রে AB দন্ডচুম্বকের অক্ষ ।
চৌম্বক দৈর্ঘ্য (Magnetic length):
চৌম্বক অক্ষ বরাবর চুম্বকের দুটি মের“র মধ্যবর্তী দূরত্বের দৈর্ঘ্যকে চৌম্বক দৈর্ঘ্য বলে। চিত্রে NS = চৌম্বক দৈর্ঘ্য।

চৌম্বক মধ্যতল (Magnetic meridian) :
চুম্বকের ভারকেন্দ্র দিয়ে মুক্তভাবে ঝুলড্ কোনো একটি স্থির চুম্বকের চৌম্বক অক্ষের মধ্য দিয়ে কল্পিত তলকে চৌম্বক মধ্যতল বলে।
ভৌগলিক মধ্যতল (Geographical meridian) :
পৃথিবীর কোনো স্থানে ভৌগলিক উত্তর ও দক্ষিণমের— বরাবর কল্পিত উলম্ব তলকে ঐ স্থানের ভৌগলিক বা জ্যামিতিক মধ্যতল বলে। চৌম্বক মধ্যতল ও ভৌগলিক মধ্যতলের মধ্যকার কিছুটা কৌণিক ব্যবধান থাকে, যাকে বিচ্যুতি বলে।
চৌম্বক দ্বিমের— (Magnetic dipole):
একটি চুম্বকের ক্ষুদ্র অণুগুলোতেও দুটি মের← থাকে। অর্থাৎ প্রতিটি অণুই এক একটি চুম্বক। চুম্বকের দুই মের← বিশিষ্ট অণুচুম্বকগুলোকে চৌম্বক দ্বিমের— বলে। তবে একটি দন্ডচুম্বককে চৌম্বক দ্বিমের= বলা যায়।
জ্যামিতিক দৈর্ঘ্য (Geomrtrical length) :
কোনো একটি দন্ডচুম্বকের দুই প্রাল্ডের মধ্যবর্তী দূরত্বকে জ্যামিতিক দৈর্ঘ্য বলে।
চৌম্বক দৈৰ্ঘ্য /জ্যামিতিক দৈর্ঘ্য = 0.85

চৌম্বক দ্বিমের— ভ্রামক বা চৌম্বক ভ্রামক:
কোনো একটি চুম্বকের যে কোনো একটি মের শক্তি এবং চৌম্বক দৈর্ঘ্যের গুণফলকে ঐ চুম্বকের দ্বিমের ভ্রামক বা চৌম্বক ভ্রামক বলে । কোনো চুম্বকের মেরশক্তি m এবং চৌম্বক দৈর্ঘ্য 2l হলে চৌম্বক ভ্রামক M = m (2l) চৌম্বক দ্বিমের— ভ্রামকের একক অ্যাম্পিয়ার মিটার (Am2)।
চৌম্বক ফ্লাক্স বা চৌম্বক আবেশ:
কোনো চৌম্বকক্ষেত্রের একক ক্ষেত্রফলের মধ্য দিয়ে লম্বভাবে অতিক্রাড় বলরেখার সংখ্যাকে চৌম্বক আবেশ বা ফ্লাক্স ঘনত্ব বা চৌম্বকক্ষেত্র ভেক্টর বলে। একে B দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। চৌম্বক আবেশ বা ফ্লাক্স ঘনত্বের একক ওয়েবার/মি’ (Wbm2) বা টেসলা ।
চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic field):
কোনো চুম্বক বা বিদ্যুৎবাহী তারের চারপাশে যে অঞ্চল জুড়ে একটি চুম্বক শলাকা এবং চৌম্বক পদার্থ বিক্ষেপিত হয় সেই অঞ্চলকে ঐ চুম্বক বা বিদ্যুৎবাহী তারের চৌম্বকক্ষেত্র বলে।

চুম্বকায়ন বা চুম্বকায়ন তীব্রতা (Magnetization):
একটি চুম্বক পদার্থের অণুচুম্বকগুলো অর্থাৎ দ্বিমের গুলো সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত থাকে। কিন্তু চৌম্বক পদার্থের অণুচুম্বকগুলো এলোমেলোভাবে সজ্জিত থাকে। যখন কোনো চৌম্বক পদার্থকে চৌম্বকক্ষেত্রে স্থাপন করা হয় তখন চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে দ্বিমের— ভ্রামকের সৃষ্টি হয়। দ্বিমের= ভ্রামকের ক্রিয়ায় অণুচুম্বকগুলো চৌম্বকক্ষেত্রে সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত হয়ে চৌম্বক পদার্থ চুম্বকে পরিণত হয়।
অর্থাৎ কোনো চৌম্বক পদার্থের প্রতি একক আয়তনের চৌম্বক ভ্রামককে চুম্বকায়ন বা চুম্বকায়ন তীব্রতা বলে ।
I= (M/V)Am’ (অ্যাম্পিয়ার/মিটার)
চৌম্বক প্রাবল্য (Magnetic Intensity ) :
চৌম্বকক্ষেত্রের কোনো চৌম্বক আবেশ এবং চৌম্বক প্রবেশ্যতার অনুপাতকে চৌম্বক প্রাবল্য বা তীব্রতা বলে। একে H দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
চৌম্বক প্রাবল্যের একক: Am” -1 অ্যাম্পিয়ার মিটার
চৌম্বক প্রবেশ্যতা (Magnetic permeability):
চৌম্বকক্ষেত্রে স্থাপিত কোনো চৌম্বক পদার্থের চৌম্বক আবেশ (B) ও চৌম্বক তীব্রতা (H) এর অনুাতকে ঐ পদার্থের চৌম্বক প্রবশ্যেতা বলে। একে .I (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
μ = B/H; এর একক TmA-1বা টেসলা-মিটার অ্যাম্পিয়ার
শূন্যস্থানে চৌম্বক প্রবেশ্যতা,
μo=Bo/H [Bo = বহিস্থ চৌম্বকক্ষেত্র]
চৌম্বক গ্রাহিতা বা প্রবণতা (Magnetic susceptibiliby):
কোনো চৌম্বক পদার্থের চুম্বকায়ন তীব্রতা (I) এবং চৌম্বক তীব্রতা (H) এর অনুপাতকে চৌম্বক গ্রাহিতা বা প্রবণতা বলে। একে K (কাপ্পা) দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
K= I / H
এটি এককবিহীন রাশি ।
যদি H=1 হয়, তবে K=1
অর্থাৎ একক প্রাবল্যের চৌম্বকক্ষেত্রে চুম্বকিত চৌম্বক পদার্থের চুম্বকায়ন পরিমাত্রাকে পদার্থটির চৌম্বক গ্রাহিতা বা প্রবণতা
বলে।

আপেক্ষিক চৌম্বক প্রবেশ্যতা (Relative magnetic permeability):
কোনো চৌম্বক পদার্থের চৌম্বক প্রবেশ্যতা ও শূন্যস্থানের চৌম্বক প্রবেশ্যতার অনুপাতকে ঐ পদার্থের আপেক্ষিক চৌম্বক প্রবেশ্যতা বলে। একে μr দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
μr = μ/μο[এককবিহীন রাশি]
চৌম্বক ধারকত্ব (Magnetic retentivity):
চুম্বাকায়ন বলের প্রভাব সরিয়ে নেওয়ার পরেও কোনো চৌম্বব পদার্থের মধ্যে উৎপন্ন চুম্বকত্ব বজায় রাখার ক্ষমতাকে চৌম্বক ধারকতা বলে। ইস্পাত ও নরম লোহাকে একই সমপরিমাণ চুম্বকায়িত করে রেখে দিলে নরম লোহার চেয়ে ইস্পাতের ক্ষেত্রে চুম্বকত্ব হ্রাসের পরিমাণ কম ।
চৌম্বক সহনশীলতা (Magnetic coercivity):
চুম্বকত্ব হ্রাসের নিয়ামকসমূহ থাকা সত্ত্বেও কোনো চৌম্বক পদার্থের মধ্যে উৎপন্ন চুম্বকত্ব বজায় রাখার ক্ষমতাকে ঐ পদার্থের চৌম্বক সহনশীলতা বলে ।
কুরি তাপমাত্রা বা কুরি বিন্দু (Curie temperature or Curie point):
যে তাপমাত্রায় কোনো চৌম্বক পদার্থের চুম্বকত্ব সম্পূর্ণ নষ্ট হয় তাকে কুরি তাপমাত্রা বলে ।
রিমেনেন্স:
চুম্বকায়ন বলের প্রভাব সারিয়ে নেওয়ার পর চৌম্বক পদার্থে যে চুম্বকায়ন মাত্রা অবশিষ্ট থাকে তাকে রিমেনেন্স বলে।

চুম্বকত্বের উৎস (Origin of Magnetism)
একটি চুম্বকের উত্তর ও দক্ষিণ দুটি মের আছে। চুম্বককে ভেঙ্গে দুটি খন্ডে SIN SIIN SIN SIN SIN SIN পরিণত করা হলে দেখা যায়, চুম্বকের মের দ্বয় পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে প্রতিটি খন্ডই এক একটি স্বতন্ত্র চুম্বকে পরিণত হয়েছে অর্থাৎ প্রতিটি খন্ডেই উত্তর ও দক্ষিণ মের— সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং আমরা বলতে পারি চুম্বকের মের—দ্বয় কখনোই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। চুম্বককে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে যদি এমন ক্ষুদ্র অংশে পরিণত করা হয় যেন তা ভাঙ্গলে আর চুম্বকত্ব থাকে না, চুম্বকের এরপ ক্ষুদ্র অংশকে অণু চুম্বক বলে। একটি চুম্বক এরূপ অসংখ্য অণু চুম্বক সমন্বয়ে গঠিত (চিত্র-৫.৪)। আর অণু চুম্বক সৃষ্টি হয় ইলেকট্রনের কক্ষীয় গতি ও ঘূর্ণন গতির কারণে।
চৌম্বক পদার্থও অণু চুম্বক সমন্বয়ে গঠিত, তবে এক্ষেত্রে অণু চুম্বকগুলো এলোমেলোভাবে অবস্থান করে বলে সামগ্রিকভাবে কোনো চুম্বকত্ব প্রকাশ পায় না। অচৌম্বক পদার্থের ক্ষেত্রে অণু বা পরমাণুর ইলেকট্রনগুলোর বিপরীতমুখী ঘূর্ণনের জন্য কোনো চুম্বকত্ব প্রকাশ পায় না। ফলে কোনো অণু চুম্বক সৃষ্টি হয় না। কিন্তু চৌম্বক পদার্থের অণু বা পরমাণুর ইলেকট্রনগুলোর ঘূর্ণনের ফলে চুম্বকত্ব শূন্য হয় না বলে অণু চুম্বক সৃষ্টি হয়।

চুম্বকায়ন (Magnetization)
আমরা জানি, সব চৌম্বক পদার্থই অসংখ্য অণু চুম্বক দিয়ে গঠিত। প্রতিটি অণু চুম্বকই এক একটি চৌম্বক দ্বিমের । চৌম্বক পদার্থ এসব চৌম্বক দ্বিমের—গুলো এলোমেলোভাবে থাকায় কোনো চুম্বকত্ব প্রকাশ পায় না। কিন্তু চৌম্বক দ্বিমের—গুলো যদি সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত থাকে, তা সে স্থায়ী বা অস্থায়ী যেভাবেই হোক না কেন, তাহলে ঐ পদার্থ চুম্বকত্ব প্রদর্শন করে । কোনো চৌম্বক পদার্থে বাইরে থেকে চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করা হলে এর অণু চুম্বক তথা চৌম্বক দ্বিমের গুলো ঘুরে চৌম্বকক্ষেত্রের সমাাল সজ্জিত হয় থাকে (চিত্র-৫.৬)। ফলে চৌম্বক পদার্থটি চুম্বকত্ব প্রাপ্ত হয়। এটি কী পরিমাণ চুম্বকত্ব প্রাপ্ত হবে তা নির্ভর করবে অণু চুম্বকগুলো কতটা সারিবদ্ধ হয়েছে তার উপর।
প্রতিটি অণু চুম্বকেরই একটি চৌম্বক ভ্রামক আছে। চৌম্বক পদার্থে অণু চুম্বকগুলোর চৌম্বক ভ্রামকের ভেক্টর যোগফল বা লব্ধি শূন্য। কিন্তু যখন কোনো চৌম্বক পদার্থ চুম্বকত্ব প্রাপ্ত হয় তখন চৌম্বক ভ্রামকের লব্ধি শূন্য হয় না। বাহ্যিক চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে কোনো চৌম্বক পদার্থে বা কোনো স্থায়ী চুম্বকের চুম্বকত্বের পরিমাণ কত তা নির্ণয় করা হয় একক আয়তনে অণু চুম্বকগুলোর লব্ধি চৌম্বক ভ্রামক দ্বারা। একে চুম্বকায়ন বলে। অর্থাৎ একক আয়তনে চৌম্বক ভ্রামককে চুম্বকায়ন বলে । চৌম্বকায়নকে দ্বারা সূচিত করা হয়।
সার-সংক্ষেপ :
চুম্বক:
চুম্বক হচ্ছে সেই সকল পদার্থ যাদের আকর্ষণ ও দিকদর্শী ধর্ম আছে। এ সকল পদার্থ দিয়ে উপযুক্ত পদার্থকে চুম্বক ধর্ম প্রদান করা যায় ।
চুম্বকত্ব (Magnetism):
চুম্বক পদার্থের ধর্মই হলো চুম্বকত্ব। চুম্বকত্ব পদার্থের ভৌত ধর্ম। কারণ পদার্থকে চুম্বকে পরিণত করলে এর ভর, ঘনত্ব, আয়তন ও তাপমাত্রার কোনো পরিবর্তন হয় না। তবে চুম্বকত্বের উপর তাপমাত্রার বাহ্যিক প্রভাব রয়েছে।
চৌম্বক দ্বিমের— (Magnetic dipole):
একটি চুম্বকের ক্ষুদ্র অণুগুলোতেও দুটি মের← থাকে। অর্থাৎ প্রতিটি অণুই এক একটি চুম্বক। চুম্বকের দুই মের← বিশিষ্ট অণুচুম্বকগুলোকে চৌম্বক দ্বিমের— বলে। তবে একটি দন্ডচুম্বককে চৌম্বক দ্বিমের বলা যায় ।
জ্যামিতিক দৈর্ঘ্য (Geomrtrical length):
কোনো একটি দন্ডচুম্বকের দুই প্রান্ড্রের মধ্যবর্তী দূরত্বকে জ্যামিতিক দৈর্ঘ্য বলে।
চৌম্বক প্রাবল্য (Magnetic Intensity):
চৌম্বকক্ষেত্রের কোনো চৌম্বক আবেশ এবং চৌম্বক প্রবেশ্যতার অনুপাতকে চৌম্বক প্রাবল্য বা তীব্রতা বলে । একে H দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

বহুনির্বাচনী প্রশ্ন:
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন।
১। চুম্বকের মের— কয়টি?
(ক) ২টি
(খ) ৩টি
(গ) ৪টি
(ঘ) ১ টি
২। ‘পৃথিবী নিজেই একটি চুম্বক’ এটি সর্বপ্রথম বলেন-
(ক) বিজ্ঞানী গোল্ড স্মিথ
(খ) ডঃ উইলেনবেগ
(গ) ডাঃ গিলবার্ট
(ঘ) ডঃ গিবস
৩। চৌম্বক অক্ষ বরাবর চুম্বকের দু’মের“র মধ্যবর্তী দূরত্বকে বলে-
(ক) জ্যামিতিক দৈর্ঘ্য
(খ) চৌম্বক দৈর্ঘ্য
(গ) চৌম্বক অক্ষ
(ঘ) চৌম্বক মধ্যতল
