চৌম্বক পদার্থের শ্রেণিবিভাগ

আজকে আমরা চৌম্বক পদার্থের শ্রেণিবিভাগ  সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা বাউবি এইচএসসি ২৮৭১ পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্র ইউনিট ৫ চুম্বকত্ব এর অন্তর্ভুক্ত।

 

চৌম্বক পদার্থের শ্রেণিবিভাগ

 

 চৌম্বক পদার্থের শ্রেণিবিভাগ

বিভিন্ন প্রকার চৌম্বক পদার্থের চৌম্বকত্ব

১। প্যারা চৌম্বকত্ব (Paramagnetic)

আপনারা অক্সিজেন, সোডিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, পণ্ডাটিনাম, টিন ইত্যাদি পদার্থের নাম শুনেছেন। এ সকল পদার্থ চৌম্বক ক্ষেত্রে রাখলে, পদার্থের মধ্যে দূর্বল চুম্বকত্ব আবিষ্ট হয় এবং এরা চুম্বকের দিকে মুখ করে থাকতে চায়। এদেরকে প্যারা চৌম্বক বলে।

প্যারা চৌম্বক পদার্থের অণু, পরমাণু, বা আয়নের স্থায়ী চৌম্বক দ্বিপোল মোমেন্ট থাকে। এসব দ্বিপোল এক একটি স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সাধারণ তাপমাত্রায় তাপজনিত কম্পন বেশি হওয়ার ফলে এই দ্বিপোল গুলো এলোমেলোভাবে থাকে।ফলস্বরূপ পদার্থের কোন এক দিকে নীট চুম্বকায়ণ (magnedisation) থাকে না। (চিত্র ৫.৯ ক) এ সকল পদার্থকে বহিঃ চৌম্বক ক্ষেত্রে স্থাপন করলে দ্বিপোলসমূহ ক্ষেত্রের অভিমুখ বরাবর সজ্জিত হওয়ার চেষ্ঠা করে। কিন্তু তাপীয় উত্তেজনা এ সজ্জিতকরণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করে।

ফলে, কিছু দ্বিপোল সজ্জিত হয় এবং ক্ষেত্রের দিকে কিছু চুম্বকায়ন ঘটায় অর্থাৎ নীট ফল হিসেবে পদার্থটি একটি চৌম্বক মোমেন্ট অর্জণ করে এবং এ চৌম্বক মোমেন্টের অভিমুখ প্রযুক্ত চৌম্বকক্ষেত্রের দিকে হয়।

 

চৌম্বক পদার্থের শ্রেণিবিভাগ

 

 

(২) ডায়া চৌম্বক (Diamagnetism)

আপনারা হাইড্রোজেন, পানি, সোনা, রূপা, তামা, বিসমাথ ইতাদি পদার্থের নাম শুনে থাকবেন। এ সকল পদার্থকে চৌম্বক ক্ষেত্রে রাখলে, পদার্থের মধ্যে দুর্বল চুম্বকত্ব সৃষ্টি হয় এবং এরা চৌম্বক ক্ষেত্র থেকে সরে যায়। অর্থাৎ সৃষ্ট চুম্বকায়নের অভিমুখ বহিঃচৌম্বক ক্ষেত্রের অভিমুখের বিপরীত দিকে হয়। এদেরকে ডায়া চৌম্বক পদার্থ বলে।

ডায়া চৌম্বক পদার্থের পরমাণুমূহের কোন স্থায়ী চৌম্বক মোমেন্ট থাকে না। এসব পরমাণুতে ইলেকট্রনের কক্ষীয় ও স্পিন গতি থেকে চৌম্বক মোমেন্ট উৎপত্তি হয়। একজোড়া ইলেককট্রনের মধ্যে একটির মোমেন্ট অন্যটির সমান ও বিপরীত হলে, এদের নীট মোমেন্ট শূন্য হবে (চিত্র ৫.১০ ক)। যেহেতু ডায়াচৌম্বক পদার্থের পরমাণুতে এ রকম বহু সংখ্যক জোড়ার সমাহার সেহেতু পদার্থের পরমাণুতে কোনো দ্বিপোল থাকে না এবং কোন নীট মোমেন্টও থাকে না ।

কিন্তু এসকল পদার্থে চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করলে চৌম্বক মোমেন্ট বিলীন হয় না। একটি নীট চৌম্বক মোমেন্ট সৃষ্টি হয় (চিত্র )। এই নীট চৌম্বক মোমেন্টের অভিমুখ প্রযুক্ত চৌম্বক ক্ষেত্রের বিপরীতে হয়।

 

চৌম্বক পদার্থের শ্রেণিবিভাগ

 

৩) ফেরো চৌম্বকত্ব (Ferromagnetism)

লোহা, নিকেল, কোবাল্ট ইত্যাদি পদার্থের কথা আপনার ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছেন। এ সকল পদার্থকে চৌম্বক ক্ষেত্রে রাখলে, পদার্থের মধ্যে শক্তিশালী চুম্বকত্ব আবিষ্ট হয় এবং আবিষ্ট চুম্বকায়নের অভিমুখ বহিঃচৌম্বক ক্ষেত্রের অভিমুখের বরাবর হয় । এদের ফেরো চৌম্বক পদার্থ বলে। ফেরো চৌম্বক পদার্থের পরমাণু তথা অণুসমূহের প্রত্যেকের নী চৌম্বক দ্বিপোল মোমেন্ট থাকে। কিন্তু দ্বিপোলগুলো স্বাধীন সত্তা হিসেবে কাজ করে না। এই দ্বিপোলগুলো বিভিন্ন ডোমেইন- এ বিভক্ত থাকে (চিত্র)। ফলে, সমষ্টিগতভাবে নীট মোমেন্ট শূন্য হয়।

 

চৌম্বক পদার্থের শ্রেণিবিভাগ

 

ফেরো চৌম্বক পদার্থকে বহিঃচৌম্বক ক্ষেত্রে স্থাপন করলে বা চুম্বকের কাছে আনলে চৌম্বক ক্ষেত্রের দিকে কিছু কিছু ডোমেইনের আকার এক সময় বৃহৎ ডোমেইন গঠন করে এবং দ্বিপোলগুলো ক্ষেত্রের দিকে পদার্থটির চুম্বকায়ন ঘটে।

৪) ফেরিচৌম্বকত্ব (Ferrimagnetism)

আপনারা রসায়ন বিষয়ে ফেরাইট (Fe3O4) নামক এক ধরনের পদার্থের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। এটি ফেরো চৌম্বকত্বের শ্রেণিভুক্ত একটি পদার্থ । এ ধরনের পদার্থে দুটি ভিন্ন ধরনের আয়ন থাকে। আয়ন সমূহের চৌম্বক মোমেন্ট প্রতি সমারাল (Anti-parallel) সজ্জায় থাকে কিন্তু এদের মান সমান নয় (চিত্র ৫.১২)। এ ধরনের পদার্থকে ফেরি চৌম্বক পদার্থ বলা হয় ।

একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার উর্ধ্বে পদার্থটিকে উত্তপ্ত করলে পদার্থটি প্যারা চৌম্বকত্ব লাভ করে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে, আয়নের মধ্যে বিনিময় যুগলায়ন (Exchange Integral) লোপ পায় ।

 

চৌম্বক পদার্থের শ্রেণিবিভাগ

 

৫। এন্টিফেরো চৌম্বকত্ব (Anti-ferromagnetism )

অপনারা রসায়ন বিষয়ে NiO, MnF2, নামক পদার্থের নাম শুনেছেন। এ সকল পদার্থকে বহিঃচৌম্বক ক্ষেত্রে রাখলে খুবই সামান্য পরিমাণে চুম্বকত্ব প্রকাশ পায়। এ ধরনের পদার্থকে এন্টি ফেরো চৌম্বক পদার্থ বলে। এ ধরনের পদার্থের আয়ন প্রতি সমাাল (Anti parallel) সজ্জায় দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে (চিত্র ৫.১৩)। অর্থাৎ বিনিময় যুগলায়ন সঠিকভাবে কার্যকর থাকে।

 

চৌম্বক পদার্থের শ্রেণিবিভাগ

 

কিন্তু একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ঊর্ধ্বে নীলতাপমাত্রায় (Neel Temperature) পদার্থটিকে উত্তপ্ত করলে উক্ত বিনিময় যুগলায়ন আর কার্যকর থাকে না। ফলে, পদার্থটি প্যারা চুম্বকত্ব লাভ করে ।

ডায়া, প্যারা ও ফেরোচৌম্বক পদার্থের পারস্পরিক তুলনা

 

ডায়াচৌম্বক পদার্থ

প্যারাচৌম্বক পদার্থ

ফেরোচৌম্বক পদার্থ

১. এরা চুম্বক দ্বারা ক্ষীণভাবে বিকর্ষিত হয় ।১. এরা চুম্বক দ্বারা ক্ষীণভাবে আকৃষ্ট হয় ।১. এরা চুম্বক দ্বারা প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়।
২. এরা কঠিন, তরল বা বায়বীয় পদার্থ হতে পারে ।২. এরা কঠিন, তরল বা বায়বীয় পদার্থ হতে পারে।২. এরা শুধু কঠিন পদার্থ ।
৩. চৌম্বক বলরেখাগুলো এদের নিকট থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে।৩. চৌম্বক বলরেখাগুলো এদের মধ্যে ঘনবদ্ধভাবে সন্নিবিষ্ট হয়।৩. বহুসংখ্যক বলরেখাগুলো এদের মধ্যে ঘনবদ্ধভাবে সন্নিবিষ্ট হয়।
৪. ম্যাগনেটাইজেশনের মান চৌম্বক প্রাবল্যের সাপেক্ষে ঋণাত্নক।৪. ম্যাগনেটাইজেশনের মান চৌম্বক প্রাবল্যের সাপেক্ষে ধনাত্নক এবং একের চেয়ে কিছু বেশি।৪. ম্যাগনেটাইজেশনের মান চৌম্বক প্রাবল্যের সাপেক্ষে ধনাত্নক এবং একের চেয়ে অনেকগুণ বেশি।
৫. প্রবেশ্যতা ! এবং সংবেদ্যতা K চুম্বকণ ক্ষেত্র প্রাবল্যের উপর নির্ভরশীল নয়।৫. প্রবেশ্যতা L এবং সংবেদ্যতা K | চুম্বকণ ক্ষেত্র প্রাবল্যের উপর নির্ভরশীল নয়।৫. প্রবেশ্যতা এবং সংবেদ্যতা K উভয়ই চুম্বকণ ক্ষেত্র প্রাবল্যের সাথে পরিবর্তিত হয়।
৬. ধারণশীলতা নেই ।৬. ধারণশীলতা নেই ।৬. ধারণশীলতা আছে।

 

সার-সংক্ষেপ :

ডায়াচৌম্বক পদার্থ:

যে সকল পদার্থকে চৌম্বক ক্ষেত্রে স্থাপন করা হলে চুম্বকায়নকারী ক্ষেত্রের বিপরীত দিকে সামান্য চুম্বকত্ব লাভ করে তাদেরকে ডায়াচৌম্ব পদার্থ বলে ।

প্যারাচৌম্বক পদার্থ:

যে সকল পদার্থকে চৌম্বক ক্ষেত্রে স্থাপন করা হলে চুম্বকায়নকারী ক্ষেত্রের দিকে সামান্য চুম্বকত্ব লাভ করে তাদেরকে প্যারাচৌম্বক পদার্থ বলে।

ফেরোচৌম্বক পদার্থ:

যে সকল পদার্থকে চৌম্বক ক্ষেত্রে স্থাপন করা হলে চুম্বকায়নকারী ক্ষেত্রের দিকে শক্তিশালী চুম্বকত্ব লাভ করে তাদেরকে ফেরোচৌম্বক পদার্থ বলে।

বহুনির্বাচনী প্রশ্নঃ

সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন

১। ডায়াচৌম্বক পদার্থ কোনটি?

(ক) বিসমাথ

(খ) অ্যালুমিনিয়াম

(গ) ম্যাগনেসিয়াম

(ঘ) ক্রোমিয়াম

২। কোন পদার্থের চৌম্বক প্রবণতা তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে হ্রাস পেতে থাকে-

(ক) প্যারাচৌম্বক

(খ) ডায়াচৌম্বক

(গ) ফেরোচৌম্বক

(ঘ) অচৌম্বক

Leave a Comment