অস্থায়ী ও স্থায়ী চুম্বক

আজকে আমরা অস্থায়ী ও স্থায়ী চুম্বক সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা বাউবি এইচএসসি ২৮৭১ পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্র ইউনিট ৫ চুম্বকত্ব এর অন্তর্ভুক্ত।

 

 

অস্থায়ী ও স্থায়ী চুম্বক

 

অস্থায়ী ও স্থায়ী চুম্বক

স্থায়ী চুম্বকঃ

বহুদিন পূর্বে এশিয়া মাইনরের ম্যাগনেশিয়া নামক স্থানে ধুসর-কালো রং এর এক ধরনের খনিজ আকরিক পাওয়া যেত। এটা লোহা ও অক্সিজেনের যৌগিক পদার্থ। স্থানের নামানুসারে এর নাম দেয়া ম্যাগনেটাইট। ম্যাগনেটাইট ছোট ছোট লোহার টুকরাকে আকর্ষণ করে বলে এর নাম দেয়া হয় ম্যাগনেট বা চুম্বক। এটা প্রাকৃতিক চুম্বক । প্রাকৃতিক চুম্বক সাধারণত দুর্বল হয়ে থাকে।

কৃত্রিমভাবে অনেক শাক্তিশালী চুম্বক তৈরি করা যায়। শক্তিশালী চুম্বক তৈরিতে ফেরোচৌম্বক পদার্থ ও ফেরিচৌম্বক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। ফেরো বা ফেরি চৌম্বক পদার্থকে উত্তপ্ত করে গলানো হয়। এরপর একে চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে ধীরে ধীরে শীতল করা হয়। ফেরো বা ফেরিচৌম্বক পদার্থকে উত্তপ্ত করা হলে এর ডোমেইন ভেঙ্গে অণুচুম্বকগুলো ইতস্তৃত বিক্ষিপ্তভাবে সজ্জিত হয় অর্থাৎ প্যারাচৌম্বক পদার্থে পরিণত হয়। বাহ্যিক চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে অণুচুম্বকগুলো সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত হয়। এ অবস্থায় একে শীতল করা হলে অনুগুলো সম্পূর্ণ সারিবদ্ধ অবস্থায় কঠিন অবস্থা প্রাপ্ত হয়, ফলে এটি শক্তিশালী চুম্বকে পরিণত হয়।

যে সকল চুম্বকের চুম্বকত্ব সহজে নষ্ট হয় না তাকে স্থায়ী চুম্বক বলে। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত চুম্বক স্থায়ী হলেও তা অত্যন্ত্ দুর্বল প্রকৃতির হয়। তাই চৌম্বক পদার্থের সাথে অন্য পদার্থের মিশ্রণে অথবা বিশেষ প্রক্রিয়ায় (স্পর্শ-ঘর্ষণ পদ্ধতি) স্থায়ী শক্তিশালী চুম্বক তৈরি করা হয়।

 

স্থায়ী চুম্বক তৈরিতে চৌম্বক পদার্থের মিশ্রণের বিভিন্নতার উপর ভিত্তি করে নিয়ে চার ধরনের স্থায়ী চুম্বক দেখানো হলো:

১। নিওডাইমিয়াম আয়রন বোরন (Niodimium iron boron):

নিওডাইমিয়াম (Niodimium) আয়রন বোরন (NdFeB or NIB) এ ধরনের স্থায় চুম্বক ল্যান্থানাইড শ্রেণিভুক্ত এবং শক্তিশালী প্রকৃতির। এদেরকে সহজে বিচুম্বকায়ন করা যায় না।

২। সেমিরিয়াম কোবাল্ট (Samirium cobalt ) (SmCo):

এটিও এক প্রকার স্থায়ী চুম্বক ।

৩। অ্যালনিকো (Alnico) :

এটি অ্যালুমিনিয়াম, নিকেল ও কোবাল্টের সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি। এটি স্থায়ী চুম্বক হলেও বিচুম্বকায়ন করা যায়। এটি বহুল ব্যবহৃত হয় তবে এর চুম্বকত্ব তাপমাত্রার উপর নির্ভরশীল।

৪। ফেরাইট (Ferrite) :

এটি বহুল ব্যবহৃত স্থায়ী চুম্বক। এর চুম্বকত্ব তাপমাত্রার উপর খুব বেশি নির্ভরশীল।

 

অস্থায়ী ও স্থায়ী চুম্বক

 

অস্থায়ী চুম্বক:

যদি কোনো চৌম্বক পদার্থ চৌম্বক ক্ষেত্রের উপস্থিতিতে চৌম্বক ধর্ম প্রদর্শন করে এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের অনুপস্থিতিতে যদি তা চুম্বকত্ব হারায় তবে তাকে অস্থায়ী চুম্বক বলে।

তড়িৎ চুম্বকঃ

তড়িৎ প্রবাহের চুম্বক ক্রিয়া থেকে আমরা জানি, একটি বৃত্তাকার কুন্ডলী বা সলিনয়েডে তড়িৎ প্রবাহিত হলে এর মধ্যে চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয় এবং এটি একটি চুম্বকে পরিণত হয়। তড়িৎ প্রবাহের ফলে এ চুম্বক সৃষ্টি হয় বলে একে তড়িৎ চুম্বক বলে। তড়িৎচুম্বক অস্থায়ী ও স্থায়ী দুই রকমেরই হতে পারে ।

একটি লম্বা অীত পরিবাহী তারকে একটি সিলিন্ডারের গায়ে যদি এমনভাবে ঘন সন্নিবিষ্ট করে স্প্রিংয়ের আকারে জড়ানো হয় যেন এর প্রতিটি পাক সিলিন্ডারের অক্ষের সাথে মোটামুটি লম্বভাবে অবস্থান করে তবে যে কুন্ডলী তৈরি হয় তাকে সলিনয়েড বলে।
একটি সলিনয়েডের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত করা হলে এর মধ্যে চৌম্বক আবেশ রেখা উৎপন্ন হয় এবং এ আবেশ রেখাগুলোর বিন্যাস একটি দন্ড চুম্বকের মতো (চিত্র)।

অর্থাৎ তড়িৎবাহী সলিনয়েড একটি দন্ড চুম্বকের ন্যায় আচরণ করে এবং এর এক প্রাড়ে উত্তর মের ও অপর প্রাড়ে দক্ষিণ মের— উৎপন্ন হয়। সলিনয়েডের যে প্রার্ল্ড থেকে দেখলে এর মধ্যে তড়িৎ প্রবাহ ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে প্রবাহিত হতে দেখা যায় সে প্রাড়ে উত্তর মের— এবং বিপরীত প্রাড়ে দক্ষিণ মের— সৃষ্টি হয়। ৫.১৫ নং চিত্র থেকে সলিনয়েডের মের দ্বয় সহজেই সনামক্ত করা যায়। সলিনয়েডের দৈর্ঘ্য বরাবর তাকালে তড়িৎ প্রবাহ যদি ৫.১৬ (ক) চিত্রানুযায়ী N দ্বারা চিহ্নিত দিকে প্রবাহিত হতে দেখা যায় তবে নিকটবর্তী প্রাড়ে N মের— অর্থাৎ উত্তর মের= আর যদি ৫.১৬ খ) চিত্রানুযায়ী s দ্বারা চিহ্নিত দিকে প্রবাহিত হতে দেখা যায় তবে নিকটবর্তী প্রাড়ে ১ মের অর্থাৎ দক্ষিণ মের— সৃষ্টি হয়েছে বুঝতে হবে।

 

অস্থায়ী ও স্থায়ী চুম্বক

 

যতক্ষণ পর্যড় তড়িৎ প্রবাহ চলবে ততক্ষণ পর্যড় লোহার দন্ডটি শক্তিশালী ~ S চুম্বক হিসাবে কাজ করবে। কিন্তু তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করলে এর চুম্বকত্ব বিলুপ্ত হবে। স্পষ্টতঃই এটি অস্থায়ী চুম্বক। এ ধরনের চুম্বককে তড়িৎচুম্বক বলা হয়। সিলিন্ডারের মধ্যে কাঁটা লোহার পরিবর্তে ইস্পাতের দ” ব্যবহার করলে সেটি স্থায়ী চুম্বকে পরিণত হবে ।

তড়িৎ চুম্বক ও স্থায়ী চুম্বকের ব্যবহার

স্থায়ী চুম্বক ও তড়িৎ চুম্বকের বিভিন্ন ব্যবহার দেখা যায়। নিচে কয়েকটি ব্যবহার আলোচনা করা হলো। স্থায়ী চুম্বকের ব্যবহারঃ
চৌম্বক কম্পাস বা দিকদর্শন যন্ত্র: সমুদ্রে জাহাজ নিয়ন্ত্রণের জন্য চৌম্বক কম্পাস বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি নৌবাহবিজ্ঞানের (Navigation) অর্ভূক্ত একটি যন্ত্র। আমরা জানি, পৃথিবী একটি বিরাট চুম্বক। এর চুম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠে মুক্তভাবে ঘূর্ণনক্ষম চুম্বক শলাকা সর্বদা উত্তর দক্ষিণ দিক বরাবর অবস্থান করে। চুম্বকের এ ধর্মকে কাজে লাগিয়ে চৌম্বক কম্পাস তৈরি করা হয়েছে।

চৌম্বক কম্পাস একটি মুক্তভাবে ঘূর্ণনক্ষম চৌম্বক শলাকা দিয়ে গঠিত (চিত্র ৫.১৭)। চুম্বক শলাকার অবস্থান দেখে দিক নির্ণয় করা হয়। এছাড়াও মাইক্রোফোন ও স্পিকার, বৈদ্যুতিক মোটরে ইত্যাদিতে স্থায়ী চুম্বক ব্যবহার করা হয়ে থাকে ।

 

অস্থায়ী ও স্থায়ী চুম্বক

 

তড়িৎ চুম্বকের ব্যবহার :

কলিং বেলঃ

চিত্রে একটি কলিং বেলের বিভিন্ন অংশ দেখানো হয়েছে। অশ্বক্ষুরাকৃতির একটি লোহার দুই বাহুতে অর্ল্ডরিত তামার তার জড়ানো থাকে। এতে তড়িৎ প্রবাহ চালনা করা হলে এটি তড়িৎ চুম্বকে পরিণত হয়। তড়িৎ চুম্বকের সামনে একটি স্প্রিংয়ের সাথে একটি নরম লোহার পাত ও একটি হাতুড়ি যুক্ত থাকে। কুন্ডলীটি চুম্বকে পরিণত হলে লোহার পাতটি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয়। এতে হাতুড়িটি সজোরে ঘন্টাকে আঘাত করে এবং ঘন্টা বেজে উঠে। কিন্তু চুম্বক লোহার পাতকে আকর্ষণ করা মাত্রই তড়িৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, ফলে তড়িৎ চুম্বক তার চুম্বকত্ব হারায়। এতে স্প্রিংটি তার পূর্বের অবস্থানে ফিরে যায় এবং পুনরায় তড়িৎ সংযোগ স্থাপিত হয়। এভাবে পুনঃ পুনঃ তড়িৎ সংযোগ ও বিচ্ছিন্ন হওয়ায় হাতুড়ি বার বার ঘন্টাকে আঘাত করে এবং ঘন্টাটি বাজতে থাকে।

 

অস্থায়ী ও স্থায়ী চুম্বক

 

স্থায়ী চুম্বকের জন্য ইস্পাত এবং বৈদ্যুতিক চুম্বকের জন্য কাঁচা লোহা উপযোগী

ইস্পাতের তুলনায় কাঁচা লোহার রিমেনেন্স বা ধারণশীলতা কিছু বেশি কিন্তু নিগ্রাহিতা অনেক কম। স্থায়ী চুম্বকের জন্য ধারণশীলতা ও নিগ্রাহিতা উচ্চমানের হওয়া প্রয়োজন। এজন্য স্থায়ী চুম্বক তৈরিতে ইস্পাত ব্যবহার করা হয়। বৈদ্যুতিক চুম্বকের জন্য ক্ষণস্থায়ী ও শক্তিশালী চুম্বকের প্রয়োজন। কাঁচা লোহার রিমেনেন্স বা ধারণশীলতা বেশি এবং নিগ্রাহিতা কম বলে এর চুম্বকণ শক্তিশালী ও ক্ষণস্থায়ী হয়। এজন্য বৈদ্যুতিক চুম্বকের ক্ষেত্রে কাঁচা লোহা ব্যবহার করা হয় ।

সার-সংক্ষেপ :

স্থায়ী চুম্বক:

যে সকল চুম্বকের চুম্বকত্ব সহজে নষ্ট হয় না তাকে স্থায়ী চুম্বক বলে ।

 অস্থায়ী চুম্বক:

যদি কোনো চৌম্বক পদার্থ চৌম্বক ক্ষেত্রের উপস্থিতিতে চৌম্বক ধর্ম প্রদর্শন করে এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের অনুপস্থিতিতে যদি তা চুম্বকত্ব হারায় তবে তাকে অস্থায়ী চুম্বক বলে।

তড়িৎ চুম্বক:

একটি বৃত্তাকার কুন্ডলী বা সলিনয়েডে তড়িৎ প্রবাহিত হলে এর মধ্যে চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয় এবং এটি একটি চুম্বকে পরিণত হয়। তড়িৎ প্রবাহের ফলে এ চুম্বক সৃষ্টি হয় বলে একে তড়িৎ চুম্বক বলে ।

ডায়নামো বা জেনারেটর:

যান্ত্রিক শক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্ডুরিত করে ডায়নামো বা জেনারেটর।

বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন

১। যে সব চুম্বকের চুম্বকত্ব সহজে নষ্ট হয় না তাদেরকে বলে-

(ক) স্থায়ী চুম্বক

(খ) অস্থায়ী চুম্বক

(গ) তড়িৎ চুম্বক

(ঘ) দন্ড চুম্বক

২। স্থায়ী চুম্বক ব্যবহার করা হয় কোনটিতে?

(ক) সলিনয়েড

(খ) ট্রান্সফরমার

(গ) মাইক্রোফোন

(ঘ) আর্মেচার

 

Leave a Comment