আজকে আমরা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা বাউবি এইচএসসি ২৮৭১ পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্র ইউনিট ৮ এর আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এর অন্তর্ভুক্ত।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব
আপেক্ষিকতার নীতি (Principle of Relativity):
আমরা যখন কোনো বস্তুর অবস্থান বা বেগ পরিমাপ করি তখন কোনো স্থির বিন্দুকে প্রসঙ্গ কাঠামো হিসাবে বিবেচনা করি। ঐ প্রসঙ্গ কাঠামো সাপেক্ষে বস্তুটির রৈখিক দূরত্বকে তার অবস্থান বলি এবং প্রসঙ্গ কাঠামো সাপেক্ষে বস্তুটির রৈখিক দ্র“তিকে বেগ বলি। কিন্তু এই মহাবিশ্বে কোনো কিছুই স্থির নয়। সুতরাং পরম স্থির বলে কোনো অবস্থান পাওয়া সম্ভব নয় যাকে স্থির প্রসঙ্গ কাঠামো হিসাবে বিবেচনা করা যায়। তাই আমরা প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে যা পরিমাপ করি তা পরম নয়। অর্থাৎ আমরা সব সময় অবস্থান বা বেগকে আপেক্ষিকভাবে পরিমাপ করি।
চিরায়ত বলবিদ্যার মতে স্থান, ভর ও সময় ধ্রুব রাশি। কিন্তু ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন এই ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটান। তার তত্ত্ব অনুসারে স্থান, ভর ও সময় ধ্রুব রাশি নয়। এগুলো সকলই আপেক্ষিক। বেগের পরিবর্তনের সাথে সাথে এদের পরিবর্তন হয়। কেবল মাত্র শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগই পরম বেগ। উচ্চ গতিশীল (আলোর কাছাকাছি বেগে) বস্তুর ক্ষেত্রে এই ধারণা পরীক্ষালব্ধমানের সাথে সম্পূর্ণভাবে মিলে যায়। আইনস্টাইনের এই তত্ত্বকে আপেক্ষিক বলা হয়।
পরমাণবিক ও নিউক্লিয় পদার্থবিজ্ঞানে এই তত্ত্বের গুরত্ব অপরিসীম। আইনস্টাইন তার আপেক্ষিক তত্ত্বে বলেন প্রাকৃতিক নিয়মাবলীর গাণিতিক সূত্রসমূহ সকল জড় কাঠামোতে অভিন্ন। এটাই আপেক্ষিকতার নীতি। ১৯১৬ সালে আইনস্টাইন আপেক্ষিকতার আরো একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। মহাকর্ষ, নাক্ষত্রিক গতিপ্রকৃতি, সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা ইত্যাদি এই তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা প্রদান করা যায়।
সুতরাং আইনস্টাইন তার আপেক্ষিক তত্ত্বকে দু’ভাগে ভাগ করেন, যথা-
১) বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব (Special Theory of Relativity )
২) সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity)
বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব মূলতঃ
স্থির জড় প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোর কোনো ঘটনা বিশেষণ বা কোনো ভৌতরাশির পরিমাপ সংক্রাড় আলোচনা। ভর, সময়, দৈর্ঘ্য, বেগ ও শক্তির আপেক্ষিকতা ইত্যাদি বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব মূলতঃ স্থির জড় প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে অসমবেগে গতিশীল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোর কোনো ঘটনা বিশেষণ বা কোনো ভৌতরাশির পরিমাপ সংক্রাড় আলোচনা । মহাকর্ষ, নাক্ষত্রিক গতিপ্রকৃতি, সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা ইত্যাদির ব্যাখ্যা ইত্যাদি সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের অর্ভুক্ত।
স্থির জড় প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে অসমবেগে গতিশীল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোটি যখন সমবেগে গতিশীল হয় তখন সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বটি বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে পরিণত হয়। সুতরাং বলা যায়, বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব হলো সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের একটি বিশেষ রূপ। আমরা এই অধ্যায়ে শুধু বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করবো। ঘূর্ণনশীল বা তরান্বিত প্রসঙ্গ কাঠামোর জন্য যে আপেক্ষিক তত্ত্ব তাকে সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব বলে।

বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের স্বীকার্য
আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব দুটি মৌলিক স্বীকার্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন এই দুটি স্বীকার্য প্রদান করেন।
প্রথম স্বীকার্যঃ-
স্থির বা গতিশীল সকল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রসমূহ অপরিবর্তিত থাকে ।
দ্বিতীয় স্বীকার্যঃ-
শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ সকল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোর পর্যবেক্ষকের জন্য একই এবং তা আলোর উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর নির্ভরশীল নয়।
প্রথম স্বীকার্যের ব্যাখ্যাঃ-
প্রথম স্বীকার্য অনুসারে সকল জড় কাঠামো পরস্পর সমতুল্য। পরম স্থির কোন কাঠামো থাকতে পারেনা। সুতরাং সকল গতিই আপেক্ষিক এবং সকল স্থিতিই আপেক্ষিক। ধরা যাক দুজন পর্যবেক্ষক পরস্পরের সাপেক্ষে ধ্রুব বেগে গতিশীল। এই দুজনের মধ্যে কে গতিশীল এবং কে স্থির তা পরস্পরের পক্ষে নির্ণয় করা অসম্ভব। একটি সমবেগে গতিশীল ট্রেনযাত্রী কামরার ভেতরে কোনো পরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করতে পারবেনা যে ট্রেনটি স্থির না গতিশীল ।
উদাহরণ স্বরূপ ধরা যাক স্থির অবস্থায় থাকা ট্রেনের পর্যবেক্ষক ট্রেনে বসে একটি বলকে উপরদিকে ছুড়ছে এবং পতন কালে লুফে নিচ্ছে। সে দেখবে বলটি সোজা উপরে কিছুদুর উঠে আবার সেই পথে তার হাতে নেমে আসছে। একই পরীক্ষণ যদি সমবেগে গতিশীল ট্রেনের পর্যবেক্ষক সম্পন্ন করতেন তবে তিনিও তাই দেখতেন।
সুতরাং সে পর্যবেক্ষকের পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে তিনি গতিশীল কি গতিশীল নন। পদার্থবিজ্ঞানের সকল পরীক্ষার ফল ট্রেনটি স্থির থাকলেও যা হবে ট্রেনটি সুষম বেগে গতিশীল থাকলেও তাই পাওয়া যাবে। সুতরাং পরস্পরের সাথে সমবেগে গতিশীল সকল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো একইরূপ সমীকরণ দিয়ে প্রকাশ করা যায়।
দ্বিতীয় স্বীকার্যের ব্যাখ্যাঃ
এই স্বীকার্য অনুসারে স্থানাঙ্ক কাঠামোর উপর আলোর গতি নির্ভর করেনা। স্থির কাঠামোর সাপেক্ষে আলোর বেগ যা হবে, যে কোন দিকে যে কোন চলমান কাঠামোর সাপেক্ষে আলোর বেগ তাই হবে। আলোক উৎস গতিশীল হলেও পর্যবেক্ষকের কাছে আলোরে বেগের কোনো পরিবর্তন ঘটবেনা। অর্থাৎ আলোর বেগ পরম বেগ।

সার-সংক্ষেপ :
বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের স্বীকার্য :
প্রথম স্বীকার্যঃ-
স্থির বা গতিশীল সকল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে পদার্থ বিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রসমূহ অপরিবর্তিত থাকে ।
দ্বিতীয় স্বীকার্যঃ-
শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ সকল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোর পর্যবেক্ষকের জন্য একই এবং তা আলোর উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর নির্ভরশীল নয়।
বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
১। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের স্বীকার্য কয়টি?
ক. ১টি
খ. ২টি
গ. ৩টি
ঘ. ৪টি
২। আপেক্ষিক তত্ত্ব কত প্রকার?
ক. ১টি
খ. ২টি
গ. ৩টি
ঘ. ৪টি
