পদার্থবিজ্ঞানে ক্যালকুলাস : ক্যালকুলাস গণিতের সবচেয়ে সুপরিচিত ক্ষেত্রগুলির মধ্যে একটি। কোন রাশির পরিবরর্তনের হার ক্যালকুলাসে আলোচনা করা হয়। এটি পদার্থবিদ্যা এবং গণিতের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করতে সাহায্য করে। দুইজন বিখ্যাত গণিতবিদ,গটফ্রাইড লিবনিজ এবং আইজ্যাক নিউটন, সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে ক্যালকুলাসের ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেন। নিউটনই প্রথম ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেন এবং এটিকে পদার্থ বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, মৌলিক গণিতের ক্ষেত্রে গাণিতিক হিসাবে যোগ বিয়োগ, গুণ ভাগ ইত্যাদি ব্যাবহ্ৃত হয় কিন্তু ক্যালকুলাসের ক্ষেত্রে ব্যাবকলন, সমাকলন ইত্যাদি ব্যাবহ্ৃত হয়।

[ পদার্থবিজ্ঞানে ক্যালকুলাস ]
পদার্থ বিজ্ঞানে ক্যালকুলাসের ব্যাবহার অত্যন্ত বিস্তৃত। গতি, মহাকর্ষ, অভিকর্ষ, শক্তির পরিমাপ, স্থিতিস্থাপকতা থেকে শুরু করে, আপেক্ষিকতা, কোয়ান্টাম তত্ত্ব, তেজষ্ক্রিয়তা, সমস্ত ক্ষেত্রেই গণনার ক্ষেত্রে ক্যালকুলাসের প্রধান দুই ক্ষেত্র, অন্তরীকরণ এবং সমাকলন এর ব্যাপক ব্যাবহার রয়েছে।ক্যালকুলাস ভূগোল, ফটোগ্রাফি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ভিডিও গেম এবং এমনকি সিনেমাটোগ্রাফিতেও ব্যাবহার করা হয়। ক্যালকুলাস মাধ্যাকর্ষণ এবং গ্রহের গতি, তরল প্রবাহ, জাহাজের নকশা, জ্যামিতিক বক্ররেখা এবং সেতু প্রকৌশল গবেষণার পাশাপাশি তেজষ্ক্রিয় পদার্থের তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের হার গণনা করতে ও ব্যবহার করা হয়।
ক্যালকুলাস দীর্ঘকাল ধরে জাহাজ নির্মাণে জাহাজের হুলের বক্রতা এবং হুলের নীচের এলাকা এবং সেইসাথে জাহাজের সামগ্রিক নকশা উভয়ই নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

পদার্থ বিজ্ঞানে ক্যালকুলাসের ব্যাবহার বর্ণনার ক্ষেত্রে ফাংশন বা অপেক্ষক এর ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাশি, অন্য রাশির উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকলে প্রথম রাশিটিকে দ্বিতীয় রাশির অপেক্ষক বা ফাংশন বলা যায়।অন্তরীকরণ ও সমাকলন পরষপর বিপরীত রাশি। সমাকলনকে যোগজীকরণ ও বলা হয়ে থাকে। এবং অন্তরীকরণের অপর নাম ব্যাবকলন। অন্তরীকরণের ক্ষেত্রে একটি রাশির সাপেক্ষে আরেকটি রাশির পরিবর্তণের হার নির্ণয় করা হয় যেখানে সমাকলনের ক্ষেত্রে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের সমষ্টির সাহায্যে নতুন কিছু পাওয়া যায়।ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস বা অন্তরীকরণ এক রাশির সাপেক্ষে আরেক রাশির পরিবর্তণ হারকে প্রকাশ করে। সমাকলন বা ইন্টিগ্রেশন হল একটি ফাংশনকে অবিচ্ছেদ্যভাবে গণনা করার প্রক্রিয়া।
চিরায়ত বলবিদ্যা এবং তড়িচ্চুম্বকত্বের সমস্ত ধারণাগুলি ক্যালকুলাসের দ্বারা গভীরভাবে সম্পর্কিত। জানা ঘনত্বের কোনও বস্তুর ভর,ভ্রামকসহ রক্ষণশীল ক্ষেত্রের মধ্যে কোনও বস্তুর মোট শক্তি ক্যালকুলাস ব্যবহার করে নির্ণয় করা যায়।ম্যাক্সওয়েলের তড়িচ্চুম্বকত্ব এবং আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বও অন্তরকলন ক্যালকুলাসের ভাষায় প্রকাশিত। বিক্রিয়া হার এবং তেজস্ক্রিয় ক্ষয় নির্ধারণে রসায়নেও ক্যালকুলাস ব্যবহৃত হয়।

গতির পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ক্যালকুলাসের ব্যাবহার ব্যাপক।গাড়ি ডিজাইনিং ও যানবাহন সংক্রান্ত বিভিন্ন বানিজ্যিক শিল্পে কম্পিউটারাইজড সফটও্যারের সাহায্যে ক্যাল্কুলাসের বিভিন্ন নীতি ব্যাবহার করে সমস্যার সমাধান করা হয়ে থাকে। এসকল ক্ষেত্রে গাড়ির বেগ, অতিক্রান্ত দুরত্ব , ত্বরণ ইত্যাদি নির্ণয়ের মাধ্যমে নকশা বাস্তবায়নে সুবিধা পাওয়া যায়। বেগ একটি ভেক্টর রাশি। যা সময়ের সাপেক্ষে সরণের হার নির্দেশ করে। সরণকে সময়ের অপেক্ষক হিসেবে প্রকাশ করা গেলে, সময়ের সাপেক্ষে সরণ ফাংশনটির পরিবর্তণের হারকে অন্তরীকরণের মাধ্যমে নিখুঁত ভাবে নির্ণয় করা সম্ভব।উল্টোভাবে কোন বস্তুর বেগ কে সময়ের সাপেক্ষে সমাকলন করা হলে বস্তুটির দ্বারা অতিক্রান্ত দুরত্ব বা সরণের মান পাওয়া সম্ভব। তাৎক্ষণিক বেগ, তাৎক্ষণিক ত্বরন ইত্যাদি ক্ষেত্রে অন্তরীকরণ বা ব্যাবকলনের ব্যাবহার রয়েছে।নিউটনিয়ান বলবিদ্যায় প্রাপ্ত সূত্র সমূহ ক্যালকুলাসের সাহায্যে সহজেই প্রমাণ করা যায়। এছাড়া কৌণিক গতির ক্ষেত্রেও ক্যাল্কুলাসের ব্যাবহার লক্ষ্যণীয়।
নিউটনের গতির সূত্রসমূহ এবং তাদের থেকে প্রাপ্ত যুগান্তকারী সূত্র F=ma(বল= ভর* ত্বরণ) এর সার্বজনীন প্রমাণের ক্ষেত্রে ক্যাল্কুলাসের ব্যাবহার রয়েছে। পরিবর্তণশীল বলের ক্ষেত্রে যেখানে সাধারণ নিয়মে সূত্রের প্রতিপাদন সহজে করা সম্ভব হয় না, ক্যাল্কুলাসের ব্যাবহার করে সহজেই তা করা যায়।এছাড়া গতিসূত্র গুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন , রকেটের গতি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ও ক্যাল্কুলাসের ব্যাপক ব্যাবহার রয়েছে। টর্কের গণনা, জড়তার ভ্রামকের বিভিন্ন রাশি প্রতিপাদনের ক্ষেত্রে ক্যাল্কুলাস ব্যাবহৃত হয়।
![পদার্থবিজ্ঞানে ক্যালকুলাস 5 কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা Quantum Physics 16 পদার্থবিজ্ঞানে ক্যালকুলাস কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা [ Quantum Physics ]](https://bn.physicsgoln.com/wp-content/uploads/2022/05/কোয়ান্টাম-পদার্থবিদ্যা-Quantum-Physics-16-300x221.jpg)
পরিবর্তণশীল বল দ্বারা কৃতকাজের পরিমাণ নির্ণয়ে সমাকলনের ব্যাবহার করা হয়।
তাপগতিবিদ্যায় মোট এনট্রপির পরিমান, সমচাপ কিংবা সমোষ্ণ অবস্থায় কৃত কাজের পরিমাণ, তাপগতিবিদ্যার বিভিন্ন সূত্রসমূহের দ্বারা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ক্যাল্কুলাসের ব্যাবহার রয়েছে।
মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র ও মহাকর্ষীয় প্রাবল্য এবং বিভব, একই ভাবে তাড়িৎচৌম্বকীয় কিংবা তড়িৎ ক্ষেত্র প্রাবল্য, বিভব এর ধারণা ব্যাখ্যায় এবং সূত্র প্রতিপাদনে ক্যাল্কুলাসের সমাকলন ও ব্যাবকলনের ব্যবহার রযেছে।তড়িৎ ক্ষেত্র প্রাবল্য নির্ণয়ে গাউসের সূত্র , কুলম্বের সূত্র রয়েছে।এদের মধ্যকার সম্পর্ক স্থাপন ও আলোচনায় ক্যাল্কুলাসের ব্যাবহার রয়েছে।
পর্যায়বৃত্তিক গতি এবং তরঙ্গ সংক্রান্ত আলোচনায় ক্যাল্কুলাসের ব্যাবহার প্রচুর।সরল দোলন গতি সম্পন্ন কণার গতির জন্য ব্যবকলনীয় সমীকরণ রয়েছে। এর সমাধানের দ্বারা সরল ছন্দিত কণার সরণ এর সমীকরন এবং পর্যায়ক্রমেবেগ, ত্বরণ এবং শক্তির পরিমান গণনার সমীকরন ও পাওয়া যায়।
পদার্থবিদ্যাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করার জন্য ক্যালকুলাসের প্রয়োজন হয়। ক্যালকুলাস ব্যবহার করে পদার্থবিজ্ঞানের উত্তোরোত্তর সাফল্য অর্জিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও ফলিত এবং তাত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে আরো উন্নতি লাভে ক্যাল্কুলাসের ব্যাপক ব্যাবহার হবে।

2 thoughts on “পদার্থবিজ্ঞানে ক্যালকুলাস”