নিউক্লিয় বিক্রিয়া

আজকে আমরা নিউক্লিয় বিক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা বাউবি এইচএসসি ২৮৭১ পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্র ইউনিট ৯ নিউক্লিয় পদার্থবিজ্ঞান এর অন্তর্ভুক্ত।

 

নিউক্লিয় বিক্রিয়া

 

নিউক্লিয় বিক্রিয়া

তেজস্ক্রিয়তার প্রকারভেদ (Types of Radioactivity)

তেজস্ক্রিয়তা দুই প্রকার। যথাঃ- প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা ও কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা ।

প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তাঃ-

কোন পদার্থ হতে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে যে তেজস্ক্রিয়তা ঘটে তাকে প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা বলে ।

কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তাঃ-

কৃত্রিম উপায়ে প্রাকৃতিক স্থায়ী মৌলের অস্থায়ী আইসোটোপ গঠন ও স্বাভাবিক নিয়মে ঐ আইসোটোপের তেজস্ক্রিয় ক্ষয়কে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা বলা হয় ।

কোনো উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কণা দিয়ে নিউক্লিয়াসকে আঘাত করলে নিউক্লিয়াসটি পরিবর্তিত হয়ে অন্য মৌল গঠন করে । একে
নিউক্লিয় বিক্রিয়া বলে। নিউক্লিয় বিক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন নিউক্লিয়াসটি স্থায়ী নিউক্লিয়াস নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে সেই
নিউক্লিয়াসটির তেজস্ক্রিয় ক্ষয় ঘটে এবং এবং অন্য কোনো মৌলের নিউক্লিয়াসে পরিনত হয়। এক্ষেত্রে শুধু তেজস্ক্রিয়
নিউক্লিয়াসটির উৎপাদন কৃত্রিম কিন্তু তেজষ্ক্রিয় ক্ষয় তার স্বাভাকিব নিয়মেই ঘটে ।

কৃত্রিম উপায়ে কোনো মৌলকে তেজস্ক্রিয় মৌলে পরিনত করলে যে তেজস্ক্রিয়তা ঘটে তাকে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা বলে ।

উদাহরণ: কার্বন, সোডিয়াম ও ফসফরাস স্থায়ী মৌল, এদের 12 C, 23Na, 31 P ইত্যাদি আইসোটোপগুলি হল স্থায়ী আইসোটোপ। অথচ কৃত্রিম উপায়ে 14 C, 24 Na বা 30p তৈরি হলে দেখা যায়, এই আইসোটোপগুলি তেজস্ক্রিয় । এইগুলিকেই সাধারণভাবে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বা রেডিও আইসোটোপ (radioactive isotope or radio isotope ) বলা হয়।

14C এর নাম রেডিও-কার্বন (radio carbon), 24 Na এর নাম রেডিও-সোডিয়াম (radio sodium) ইত্যাদি। উলিণ্ঢখিত রেডিও -আইসোটোপগুলির তেজস্ক্রিয় বিঘটনের সমীকরণ নিম্নলিখিতভাবে লেখা যায়:

 

নিউক্লিয় বিক্রিয়া

 

কৃত্রিম উপায়ে যে মৌলগুলির অস্থায়ী আইসোটোপ তৈরি হয়, প্রকৃতিতে স্থায়ী অবস্থাতেও সেই মৌলগুলিকে দেখা যায়। রেডিও আইসোটোপগুলির ক্ষয় হয় প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তার সূচকীয় নিয়ম অনুসারে। অর্থাৎ আইসোটোপগুলি কৃত্রিম উপায়ে গঠিত হলেও এদের তেজস্ক্রিয় বিঘটন কৃত্রিম নয় ।

মৌলের কৃত্রিম রূপান্ডুর (Artificial Transformation of Elements) :

তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের ফলে মৌলের স্বাভাবিক রূপার ঘটে। কিন্তু কৃত্রিম উপায়ে যদি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের প্রোটন সংখ্যার
পরিবর্তন ঘটানো যায় তাহলে মৌলটি অন্য মৌলে রূপারিত হয়। একে কৃত্রিম মৌলের রূপা বলে। সাধারণ ভাবে দুই প্রকারে মৌলের রূপাড় হয়।

১। কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা (Artificial radioactivity)

২। নিউক্লিয় বিক্রিয়া (Nuclear Reaction)

কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা সম্বন্ধে পূর্বে আলাচনা করা হয়েছে। আমরা এখানে নিউক্লিয় বিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করব।

নিউক্লিয় বিক্রিয়া (Nuclear Reaction) :

কৃত্রিম উপায়ে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন কোনে মৌল গঠনের প্রক্রিয়াকে নিউক্লিয় বিক্রিয়া বলে। আমরা দেখেছি, পরমাণুর প্রতিটি নিউক্লিয়নের অর্থাৎ নিউট্রন ও প্রোটনের বন্ধন শক্তি গড়ে প্রায় 8MeV । সুতরাং বাইর থেকে প্রায় এর সমমানের শক্তি সরবরাহ না করা হলে নিউক্লিয়াসের কোনো পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। তাই সাধারণ ভাবে উচ্চশক্তি সম্পন্ন কোনো কণা দিয়ে বস্তু খন্ডকে আঘাত করে তার মধ্যস্থিত নিউক্লিয়াসকে যথেষ্ট শক্তি সরবরাহ করা যায় এবং এই ভাবেই নিউক্লিয়াসের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। এই প্রক্রিয়ায় কোনো উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কণা দিয়ে নিউক্লিয়াসকে আঘাত করা হয় এবং এর ফলে নিউক্লিয়াসটি পরিবর্তিত হয়ে অন্য নতুন মৌলের নিউক্লিয়াস গঠন করে।

 

নিউক্লিয় বিক্রিয়া

 

রাসায়নিক বিক্রিয়া ও নিউক্লিয় বিক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য :

রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরমাণুর বহিঃস্থ অনুমোদিত কক্ষপথের ইলেকট্রনের অংশগ্রহন করে। এই বিক্রিয়ার ফলে নতুন কোনো পরমাণু বা মৌলের সৃষ্টি হয় না বরং নতুন অণু গঠন করে। অপর দিকে নিউক্লিয় বিক্রিয়ায় কৃত্রিম উপায়ে পরমাণুর
নিউক্লিয়াসের পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন কোনে মৌল গঠন করে।

রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সংশিষ্ট শক্তির পরিমাণ অত্যন্ত্ কম এবং এর মান eV ক্রমের। অপর দিকে নিউক্লিয় বিক্রিয়ায় সংশিণ্টষ্ট শক্তির পরিমান অত্যড় বেশী এবং এর মান MeV ক্রমের অর্থাৎ 10°eV ক্রমের।

নিউক্লীয় বিক্রিয়ার সমীকরণ (Equation of Nuclear Reaction) :

যে নিউক্লিয়াস কে আঘাত করা হয় তাকে লক্ষ্যবস্তু (Terget) এবং যে কণা দিয় আঘাত করা হয় তাকে প্রক্ষিপ্ত কণা (Projectile) বলে। এই সংঘর্ষের ফলে একটি বা একাধিক নতুন কণা উচ্চ গতিশক্তি নিয়ে নির্গত হয় এবং নতুন মৌলের নিউক্লিয়াস গঠিত হয়।
লক্ষ্যবস্তু নিউক্লিয়াসকে X, প্রক্ষিপ্ত কণাকে a, উৎপন্ন নিউক্লিয়াসকে Y এবং নির্গত কণাকে b দিয়ে প্রকাশ করা হলে, নীচের সমীকরণ দিয়ে নিউক্লীয় বিক্রিয়া দেখানো যায়, a + X  Y + b

ভর সংখ্যার সংরক্ষণ:

উপরের সমীকরণে a,X, Y ও b এর ভর সংখ্যা যথাক্রমে A1, A2, A3, ও A4 হলে,

A1 + A2 = A3 + A4

পারমাণবিক ভর সংখ্যার সংরক্ষণঃ

উপরের সমীকরণে a, X, Y ও b এর পারমাণবিক ভর সংখ্যা যথাক্রমে Z1, Z2, Z3 ও Z4 হলে, Z1 + Z2 = Z3 + Z4

শৃঙ্খল বিক্রিয়া (Chain Reaction) :

শৃঙ্খল বিক্রিয়া এমন একটি বিক্রিয়া যা একবার শুর— হলে ওকে চালাবার জন্য অন্য কোনো অতিরিক্ত উৎস বা শক্তির প্রয়োজন হয় না বরং এটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে চলতে থাকে ।

একটি ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াস 2 U235 কে একটি তাপীয় নিউটন øn’ দিয়ে আঘাত করলে ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াস 92
বিভাজিত হবার সময় একাধিক নিউটনের সৃষ্টি হয়।

 

নিউক্লিয় বিক্রিয়া

 

সমীকরণে দেখানো নিউক্লীয় ফিশনের ক্ষেত্রে, U এর ওপর আপতিত নিউট্রনের সংখ্যা 1, কিন্তু উৎপন্ন নিউট্রনের সংখ্যা 3 । এই 3 টি নিউট্রনকে মন্দীভূত করে তাপীয় নিউট্রনে পরিণত করা হয়। সেগুলি দিয়ে আবার নিউক্লীয় বিভাজন ঘটানো হলে পরবর্তী ধাপে 3 টি U নিউক্লিয়াসের বিভাজন ঘটবে।

 

নিউক্লিয় বিক্রিয়া

 

3টি U নিউক্লিয়াসের বিভাজনের ফলে আবর ৭টি 92 নিউট্রন উৎপন্ন হয়। এই ভাবে ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াস শেষ না হওয়া পর্যন্ত্ বিভাজন স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এই ধারাবাহিক বিভাজনের ঘটনাকে শৃঙ্খল বিক্রিয়া বলা হয়। সর্বদাই তিনটি নিউট্রন সৃষ্টি হবে, এমন নয়। গড়ে প্রায় তিনটি নিউট্রন সৃষ্টি হয়। (৯.৭.১ নং) অনুচ্ছেদে দুইটি নিউট্রন সৃষ্টির উদাহরণ দেওয়া আছে।

সার-সংক্ষেপ :

তেজষ্ক্রিয়তার প্রকারভেদ ঃ

তেজস্ক্রিয়তা দুই প্রকার । যথাঃ- প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা ও কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা।

প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তাঃ-

কোন পদার্থ হতে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে যে তেজস্ক্রিয়তা ঘটে তাকে প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা বলে।

কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তাঃ-

কৃত্রিম উপায়ে প্রাকৃতিক স্থায়ী মৌলের অস্থায়ী আইসোটোপ গঠন ও স্বাভাবিক নিয়মে ঐ | আইসোটোপের তেজস্ক্রিয় ক্ষয়কে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা বলা হয়।

মৌলের কৃত্রিম রূপান্ত্র ঃ

তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের ফলে মৌলের স্বাভাবিক রূপার ঘটে। কিন্তু কৃত্রিম উপায়ে যদি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের প্রোটন সংখ্যার পরিবর্তন ঘটানো যায় তাহলে মৌলটি অন্য মৌলে রূপান্ডুরিত হয়। একে কৃত্রিম মৌলের রূপা বলে।

নিউক্লিয় বিক্রিয়া ঃ

কৃত্রিম উপায়ে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন কোনে মৌল গঠনের প্রক্রিয়াকে নিউক্লিয় বিক্রিয়া বলে ।

শৃঙ্খল বিক্রিয়া :

শৃঙ্খল বিক্রিয়া এমন একটি বিক্রিয়া যা একবার শুর— হলে ওকে চালাবার জন্য অন্য কোন অতিরিক্ত | উৎস বা শক্তির প্রয়োজন হয় না বরং এটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে চলতে থাকে।

 

নিউক্লিয় বিক্রিয়া

 

বহুনির্বাচনী প্রশ্নঃ

১। ঋণাত্মক B ক্ষয়ে

ক. পরমাণুর একটি ইলেকট্রন নিঃসৃত হয়।

খ. আগে থেকেই নিউক্লিয়াসের অবস্থিত ছিল, এরকম একটি ইলেকট্রন নিঃসৃত হয়

গ. নিউক্লিয়াসের একটি নিউট্রনের ক্ষয়ের ফলে ইলেকট্রন নিঃসৃত হয়

ঘ. নিউক্লীয় বন্ধন শক্তি একটি অংশ ইলেকট্রনে রপান্ডুরিত হয়

২। কোন উক্তিটি সঠিক?

ক. B-রশ্মি ও ক্যাথোড রশ্মি সদৃশ

খ. ‘y-রশ্মি হল উচ্চ শক্তিসম্পন্ন নিউট্রনের স্রোত

গ. -কণাগুলি একক আয়নিত হিলিয়াম পরমাণু

ঘ. প্রোটন ও নিউট্রনের ভর হুবহু এক

Leave a Comment